~•অবিলম্বে সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাতে হবে•~
১) প্রশিক্ষণ যেকোনো সেনাবাহিনীর প্রাণশক্তি। প্রশিক্ষণ ছাড়া, সৈন্যদের দক্ষতা কমে যায় এবং প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাস পায়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী পুলিশি ভূমিকায় আটকা পড়ে আছে। তাদের প্রশিক্ষণ স্থগিত, তাদের প্রস্তুতি দুর্বল, তাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত। এটি আর চলতে পারে না।
২) ইতিহাস আমাদের একটি সুস্পষ্ট শিক্ষা দেয়: বিপ্লবী পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের নাজুক দশা বাইরের হুমকিকে উৎসাহিত করে। ১৭৮৯ সালের পর ফ্রান্সকে অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া, রাশিয়া এবং ব্রিটেনের হস্তক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর রাশিয়ার রেড আর্মি’কে শ্বেত বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার এক ক্রান্তিকাল পার করছে বাংলাদেশ এবং সাম্প্রতিক বিশ্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অননুমেয় পালাবদলের বাস্তবতায় নিজেদের নিরাপদ ভাবা মোটেই উচিত হবে না। আক্রমণের মুখে একটি অপ্রস্তুত সেনাবাহিনী জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
৩) সশস্ত্র বাহিনীর কর্তব্যের বাইরে অপব্যবহার এরই মধ্যে ক্ষতি করে ফেলেছে। বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রশিক্ষিত সৈন্যরা নিজ দেশের নাগরিকদের শৃংখলা রক্ষায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে। এই দৃশ্য তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে এবং সশস্ত্র বাহিনী বিরোধী কণ্ঠস্বরকে ইন্ধন যোগাচ্ছে। আরও বিপজ্জনক হলো, প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রতিটি মাস তাদের যুদ্ধ সক্ষমতা হ্রাস করছে।
৪) সমস্যাটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতার ঘাটতির ভিতর নিহিত। তাই কৌশলের পরিবর্তে সুবিধাজনক পথ বেছে নিতে হয়েছে সরকারকে। ফলে সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার বাস্তবতা উপেক্ষা করে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনীর উপর নির্ভর করছে । সরকারের খুব কম সংখ্যক ব্যক্তিই বোঝেন যে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় সম্পর্কিত। তাদের অজ্ঞতা, ক্ষীণ-দৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্তের সাথে মিলিত হয়ে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। দেশের শেষ প্রতিরক্ষা লাইন গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার মতো দেরি হওয়ার আগেই আত্মঘাতি এ পথ ছাড়তে হবে।
৫) এদিকে পুলিশকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। জুলাই বিপ্লবে পুলিশের আক্রমণাত্মক ভূমিকা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। তবুও সংস্কারের পরিবর্তে, ফ্যাসিবাদি জামানায় দলীয় সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভয় এবং নিষ্ক্রিয়তা তাদের পঙ্গু করে রেখেছে, সেনাবাহিনীকে এই শূন্যতা পূরণ করতে হচ্ছে। সেনাবাহিনীর জওয়ানরা যতক্ষণ পুলিশের কাজে নিয়োজিত থাকবে, ততক্ষণ পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালনে সক্রিয় হবে না।
৬) কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনীর থাকা উচিত। এটি একটি সরল-মনা ধারণা। সৈন্যরা রোবট নয়। তাদের বিশ্রাম, পুনর্গঠন এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের প্রয়োজন। আরও সমস্যাজনক হলো, নির্বাচন পর্যন্ত তাদের উপস্থিতি বেঁধে রাখলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যদি ভোট বিলম্বিত হয় বা সংস্কার দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে কি সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য মোতায়েন থাকবে? বস্তুত এটি প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের দিকে আগাতে থাকা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখনই ব্যারাকে ফিরলেও ঠিক নির্বাচনের আগে আগে সেনাবাহিনীকে আবার নিয়োজিত করতে কোন বাধা নেই।
৭) অনির্দিষ্টকালের জন্য নীরব থাকা ঠিক হবে না; বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের সাথে সেনানেতৃত্বের আন্তরিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। বছর পার করেও পুলিশি দায়িত্বে মোতায়েন থাকায় সেনাবাহিনীর অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং কার্যকারিতা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত। সশস্ত্র বাহিনীকে এভাবে নিয়োজিত রেখে সরকার যদি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক যুদ্ধপ্রস্তুতিকে অবহেলা করে, তবে ভবিষ্যতের যে কোনো বিপর্যয়ের জন্য তাদের দায়ভার নিতে হবে। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যুদ্ধ প্রায়শই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে আসে, প্রস্তুতির দুর্বলতর অবস্থা শত্রুকেও প্রণোদিত করে।
৮) রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বাংলাদেশ জুয়া খেলতে পারে না। সশস্ত্র বাহিনীই বর্তমানে একমাত্র কার্যকর জাতীয় প্রতিষ্ঠান। ঠিক এই কারণেই তাদের রক্ষা করতে হবে। সেনাবাহিনীর মর্ম ও দক্ষতাবিনাশী পুলিশি দায়িত্ব এবং অভ্যন্তরীণ সংকটে ব্যবহার করে তাদের একটি ভোঁতা হাতিয়ারে পরিণত করা উচিত নয়, যা এমনকি তাদের বিতর্কিতও করে তোলে। তাদের আসল লক্ষ্য— জাতীয় প্রতিরক্ষা, তাদের সঠিক স্থান হলো ব্যারাক, নিয়মিত কঠোর প্রশিক্ষণ এবং অপ্রত্যাশিতভাবে আসতে পারে এমন হুমকির জন্য প্রস্তুত থাকা।
৯) এই অবক্ষয় চলতে দিয়ে আমরা অকল্পনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছি: একটি দেশ যার শেষ প্রতিরক্ষা দেয়াল নেই। খুব দেরি হওয়ার আগেই অন্তর্বর্তী সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।