ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিবর্তন ও পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা : মাওলানা আতিকুর রহমান কামালী
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনো আকস্মিক বিপ্লবের ফসল নয়, বরং এটি দীর্ঘ মেয়াদী সংস্কার ও নৈতিক উত্তরণের এক জীবন্ত ইতিহাস। আধুনিক সময়ে রাষ্ট্র ও শরিয়াহ নিয়ে যে বিতর্ক বিদ্যমান, তার নিরসনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সীরাত এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসন পদ্ধতিই আমাদের জন্য ধ্রুবতারা। মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনেক আগে হাবাশার হিজরত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, একটি ভূখণ্ডে পূর্ণ শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার আগে ইনসাফ ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ধর্মের প্রাথমিক দাবি।
১. মক্কি জীবনের দর্শন: রাষ্ট্র নয়, আগে নাগরিক বিনির্মাণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় দাওয়াতের দীর্ঘ ১৩ বছর অতিবাহিত করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে কোনো প্রশাসনিক হুদুদ বা রাষ্ট্রীয় বিধান নাজিল হয়নি। অথচ আল্লাহ চাইলে মক্কার প্রথম দিনেই শাসনতন্ত্র ঘোষণা করতে পারতেন। কেন করেননি? কারণ, রাষ্ট্র গঠনের আগে প্রয়োজন ছিল একটি আদর্শিক জাতি। রাষ্ট্র কাঠামোর চেয়ে মানুষই ছিল ইসলামের কাছে অগ্রাধিকার। আগে ঈমান ও আকিদার মাধ্যমে ব্যক্তির নৈতিক সংস্কার সাধনই ছিল ইসলামি ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর।
২. ধাপে ধাপে পরিবর্তন: মদ্যপান নিষিদ্ধকরণের উদাহরণ
পুরো সমাজব্যবস্থা একদিনে বদলানো সুন্নাহর পরিপন্থী। মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও মনস্তত্ত্ব বিবেচনা করে ইসলাম সর্বদা নমনীয় নীতি অবলম্বন করেছে। মদ্যপান নিষিদ্ধকরণের তিনটি স্তরই তার প্রমাণ:
প্রথম স্তরে: সতর্কীকরণ (উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি)।
দ্বিতীয় স্তরে: ইবাদতের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে আংশিক নিষেধাজ্ঞা।
তৃতীয় স্তরে: চূড়ান্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা।
যদি ইসলাম একটি অভ্যাস ত্যাগের জন্য সময় দিতে পারে, তবে একটি শতাব্দী প্রাচীন শাসনব্যবস্থা আমূল পরিবর্তনের জন্য যে যৌক্তিক সময় প্রয়োজন, তা অনস্বীকার্য।
৩. মদিনা রাষ্ট্র ও বাস্তবমুখী সক্ষমতা
মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও একদিনে সব আইন পাল্টে দেননি। অমুসলিমদের সাথে 'মদিনা সনদ' বা পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে একটি বহুত্ববাদী সমাজ গঠন করেছিলেন। ইসলামি শরিয়াহর নিজস্ব পদ্ধতিই হলো সক্ষমতা ও সামাজিক বাস্তবতাকে বিচার করে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন আনা।
৪. হুদাইবিয়ার সন্ধি: কৌশলগত বিজয়
হুদাইবিয়ার সন্ধি আপাতদৃষ্টিতে আদর্শিক পিছুটান মনে হলেও কুরআন একে বলেছে ‘স্পষ্ট বিজয়’ (ফাতহুম মুবিন)। দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের জন্য সাময়িক ছাড় দেওয়া কোনো পরাজয় নয়, বরং এটিই হলো নববী প্রজ্ঞা ও মহাদূরদর্শী কৌশল। ইসলামে আবেগ নয়, বরং হিকমত বা প্রজ্ঞার গুরুত্ব অনেক বেশি।
৫. প্রশাসনিক নমনীয়তা ও উমরের (রা.) দুর্ভিক্ষকালীন সিদ্ধান্ত
হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় চুরির অপরাধে নির্ধারিত শাস্তি স্থগিত করা হয়েছিল। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইসলামি আইন কোনো যান্ত্রিক রোবট নয়। সমাজ যখন মানুষের নূন্যতম অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করতে ব্যর্থ হয়, তখন আইন প্রয়োগের আগে ইনসাফ ও মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা খলিফার দায়িত্ব।
সারসংক্ষেপ;
ইতিহাস ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামি পরিবর্তনের মূল সূত্র তিনটি:
১. ব্যক্তি সংস্কার: আগে মানুষ তৈরি করা, পরে আইন প্রয়োগ।
২. মানবিক নিরাপত্তা: আইনের দণ্ড প্রয়োগের আগে নাগরিকের জানমাল ও ইনসাফ নিশ্চিত করা।
৩. পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন: আবেগে তাড়িত হয়ে কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে পরিবর্তন আনা।
মাওলানা আতিকুর রহমান কামালী
অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনীতিবিদ।