পদ্মহেম ধামের প্রতিষ্ঠাতা কবির হোসেনের ওপর হামলার বিচার দাবিতে বাউল ও লোকশিল্পীদের বিশাল মানববন্ধন
আয়াত উল্ল্যাহ, ঢাকা:
"মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি"—এই অসাম্প্রদায়িক বাণী ও স্লোগানকে সামনে রেখে, দেশব্যাপী বাউল সাধকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ এবং সাংবাদিক ও বাউল সংগঠক কবির হোসেনের ওপর বর্বরোচিত হামলার বিচার দাবিতে রাজধানীতে এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৪ জুন ২০২৬, রবিবার বিকেল ৪:০০ টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ১ নম্বর গেট সংলগ্ন সড়কে ‘বাংলাদেশ বাউল ও লোকশিল্পী সংস্থা’ এই প্রতিবাদী মানববন্ধনের আয়োজন করে।
প্রখ্যাত বাউল ও লোকশিল্পী শফি মন্ডলের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের অন্যতম প্রধান সংগঠক হীরক রাজার নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিপুল সংখ্যক বাউল সাধক, বাউলানি ও লোকশিল্পী এই মানববন্ধনে অংশ নেন। মানববন্ধনটি সফল ও স্বার্থক করতে বর্তমান জাতীয়তাবাদী সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকাস্থ বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরাও সংহতি প্রকাশ ও সার্বিক সহযোগিতা করেন।
ঐতিহ্যের সংকট ও গভীর উদ্বেগ
মানববন্ধনে বাউল নেতারা একটি লিখিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠ করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বাউল সম্প্রদায় হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম ধারক। বাউল দর্শন মানুষের মধ্যে সাম্য, প্রেম ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। ২০০৮ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) বাউল গানকে বিশ্বের সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে "Masterpiece of the Oral and Intangible Cultural Heritage of Humanity" হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য গৌরব।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউলশিল্পী, বাউল সাধক, আখড়া এবং লোকসংস্কৃতি চর্চাকারীদের ওপর বারবার হামলা, নির্যাতন, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সংস্কৃতিবিরোধী অপরাধী ও হামলাকারীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি পদ্মহেম ধামের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট বাউল সংগঠক ও সাংবাদিক কবির হোসেনের ওপর সংঘটিত ন্যাক্কারজনক হামলা দেশব্যাপী বাউল, লোকশিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মনে গভীর ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে। বক্তারা বলেন, একজন সংস্কৃতিসেবক ও বাউল সংগঠকের ওপর এই হামলা কেবল ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, বাউল দর্শন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত।
বাউল ও লোকশিল্পী সংস্থার প্রধান দাবি ও আহ্বান
সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ বাউল ও লোকশিল্পী সংস্থা’ বিশ্বাস করে যে, বাউলশিল্পী, সাধক ও আখড়াগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ইউনেস্কো স্বীকৃত এই অনন্য ঐতিহ্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও বিকাশ সম্ভব নয়। তাই এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে বাউল সংস্কৃতির সুরক্ষা, গবেষণা, বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক প্রচারে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানানো হয়।
একই সাথে তারা প্রশাসনের প্রতি অবিলম্বে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে এই ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। অন্যথায় পদ্মহেম ধামের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে সেখানে চলমান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
মানববন্ধন থেকে বাউল ও লোকশিল্পীদের অস্তিত্ব রক্ষায় মূলত নিম্নোক্ত প্রধান দাবিগুলো জোর দিয়ে তুলে ধরা হয়:
১. বাউল সংগঠক ও সাংবাদিক কবির হোসেনের ওপর হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. পদ্মহেম ধামের সার্বিক নিরাপত্তা এবং এর সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. দেশব্যাপী বাউল শিল্পী, বাউল আখড়া ও সাধকদের ওপর সংগঠিত সব ধরনের হামলা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার করতে হবে।
৪. ইউনেস্কো স্বীকৃত বাউল ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্রকে বিশেষ এবং দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৫. বাউল ও লোকসংস্কৃতি চর্চার জন্য দেশজুড়ে নিরাপদ, সহনশীল ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
৬. বাউল শিল্পী ও লোকশিল্পীদের সামাজিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি করতে হবে।
এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেশের সকল বাউল, লোকশিল্পী, সংস্কৃতিসেবী, সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী এবং সংস্কৃতিপ্রেমী সাধারণ নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাউলদের এই নায্য আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।