স্মৃতির বটতলায় এক শূন্যতার নাম দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া
ত্রিশালের মাটি মানেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী আত্মা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর সংগ্রামী মানবতার এক চিরন্তন উত্তরাধিকার। এই স্মৃতিধন্য জনপদের বুকেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়—যা কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং ইতিহাস, স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের এক জীবন্ত স্মারক। কিন্তু আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে গর্বের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের গভীরে জমে ওঠে এক গভীর শূন্যতা, এক অপূরণীয় বেদনা। কারণ—যাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, আন্তরিকতা ও প্রত্যক্ষ উদ্যোগে এই স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল, সেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ স্মৃতির পাতায় চিরনিদ্রায়।
২০০৫ সালের ১ মার্চ—নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয়, আবেগময় দিন। সেদিন দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজ হাতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সময়ের স্বল্পতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা—কোনো কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। ত্রিশালবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, নজরুলপ্রেমী মানুষের আকাঙ্ক্ষা আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন—সবকিছুকে গভীর গুরুত্ব দিয়ে তিনি তাঁর সরকারের শেষ সময়ে দ্রুততার সঙ্গে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করান। এই সিদ্ধান্ত ছিল কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি ছিল ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও জাতির মনন গঠনের প্রতি এক নিঃস্বার্থ দায়বদ্ধতা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালেই একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ছিল অসাধারণ দূরদর্শিতা ও গভীর অর্থবহ এক রাষ্ট্রনায়কসুলভ প্রজ্ঞার পরিচয়। যে বটতলার ছায়ায় কবি নজরুল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন, সেই বটতলার পাশেই স্থাপিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন ফলক। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উন্মোচন করা সেই ফলক আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে—সময়কে সাক্ষী রেখে, ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে। কিন্তু আজ সেই ফলকের দিকে তাকালে চোখে জল আসে, বুকের ভেতর হাহাকার জাগে। মনে হয়, ইতিহাসের এক জীবন্ত অভিভাবক যেন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা ছিল সহজ নয়। সীমিত অবকাঠামো, নানা প্রতিবন্ধকতা আর অনিশ্চয়তার মাঝ দিয়েই তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তবুও আজ এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে, চিন্তায় ও সৃষ্টিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে নজরুলের সাম্য, মানবতা ও বিদ্রোহের আদর্শ। এই অর্জনের পেছনে যাঁদের অবদান ইতিহাসে অগ্রগণ্য হয়ে থাকবে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁদের মধ্যে অন্যতম—এ কথা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই।
কিন্তু আজ সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁর চলে যাওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; এটি একটি সময়ের, একটি প্রজ্ঞার, একটি অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের বিদায়। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট-পাথর, প্রতিটি প্রাঙ্গণ যেন নীরবে স্মরণ করে সেই মহীয়সী নারীকে, যিনি বিশ্বাস করেছিলেন—ত্রিশালের মাটিতে গড়ে ওঠা একটি বিশ্ববিদ্যালয় একদিন জাতির মননকে আলোকিত করবে।
স্মৃতির বটতলার ছায়ায় দাঁড়িয়ে আজ তাই মনে হয়—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানের আলয় নয়, এটি কৃতজ্ঞতার এক স্থায়ী স্মারক। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চলে গেলেও তাঁর সিদ্ধান্ত, তাঁর দূরদৃষ্টি, তাঁর অবদান আর তাঁর স্মৃতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে—যতদিন ত্রিশালের বাতাসে নজরুলের গান বাজবে, ততদিন তাঁর নামও শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হবে।
লেখক নজরুল ইসলাম (কাজল)
যুগ্ম আহ্বায়ক
বাংলাদেশ আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী কর্মচারী ফেডারেশন