1. dailyainerkantho@gmail.com : admin :
আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ছক: বন্ধুত্বের মুখোশ ও স্বার্থের বাস্তবতা : মাওলানা আতিকুর রহমান কামালী - dailyainerkantho
৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| গ্রীষ্মকাল| বৃহস্পতিবার| দুপুর ২:৪২|

আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ছক: বন্ধুত্বের মুখোশ ও স্বার্থের বাস্তবতা : মাওলানা আতিকুর রহমান কামালী

ডেস্ক রিপোর্ট
  • Update Time : মঙ্গলবার, মার্চ ৩, ২০২৬,
  • 191 Time View

আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ছক: বন্ধুত্বের মুখোশ ও স্বার্থের বাস্তবতা : মাওলানা আতিকুর রহমান কামালী

ভূমিকা: আদর্শ বনাম কৌশল।
বিশ্বরাজনীতির দাবার ছকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—এই পরাশক্তিগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থকেই (National Interest) সর্বাগ্রে স্থান দেয়। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক মূলত সেই স্বার্থের সমীকরণেই নির্ধারিত হয়। যখন ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা, জ্বালানি নিরাপত্তা কিংবা কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে, তখন তারা বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। কিন্তু স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলেই সেই মুখোশ খুলে যায়, বেরিয়ে আসে আধিপত্যবাদের প্রকৃত রূপ।

১. ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: নেতৃত্ব নির্মূলের ষড়যন্ত্র।
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা বর্তমানে চরম রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কেবল অর্থনৈতিক অবরোধেই ক্ষান্ত নয়, বরং তারা ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে চায়। বিশেষ করে, ইরানের ধর্মীয় সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী এবং তার পরিবারকে লক্ষ্য করে হত্যার বা ‘টার্গেটেড কিলিং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নোংরা অধ্যায়। ( ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার সময় তিনি নিহত হন বলে জানা গেছে। ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন (IRIB) এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করে।) কাসেম সোলাইমানিকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে পরাশক্তিগুলো মুসলিম দেশগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে ওই অঞ্চলে নেতৃত্বশূন্যতা এবং চরম অরাজকতা তৈরি করতে চায়। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধ নয়, বরং একটি আদর্শিক ও অস্তিত্বের লড়াই।

২. পাকিস্তান ও আফগানিস্তান: ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত।
বর্তমানে অত্যন্ত বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে। দুটি মুসলিম রাষ্ট্র, যাদের রয়েছে অভিন্ন সীমান্ত ও ইতিহাস, আজ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।
“আফগানিস্তান: ২০ বছরের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তান ত্যাগ করে, তারা দেশটিকে এক চরম অস্থিরতার মধ্যে ফেলে গেছে। তাদের ছেড়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিভেদ আজ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনার জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
“পাকিস্তান: পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের ‘ওয়ার অন টেরর’-এ মিত্র হিসেবে ভূমিকা রাখা পাকিস্তান আজ নিজেই সেই যুদ্ধের শিকারে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত সংঘর্ষ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পেছনে পরাশক্তিগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাত থাকা অস্বাভাবিক নয়। এই দুই ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো ওই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়।

৩. উদীয়মান শক্তি ও অর্থনৈতিক ফাঁদ।
চীন ও রাশিয়া নিজেদের ‘বিকল্প বন্ধু’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও তাদের লক্ষ্য অভিন্ন। চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এর মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোতে বিনিয়োগ করছে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বিশাল ঋণের বোঝা। উইঘুর মুসলিমদের ইস্যুতে চীনের অবস্থান এবং সিরিয়া সংকটে রাশিয়ার ভূমিকা প্রমাণ করে যে, তাদের বন্ধুত্বের ভিত্তিও কেবলই নিজস্ব প্রভাব বিস্তার।

৪. ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও বর্তমান বাস্তবতা।
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়, সততা ও পারস্পরিক সম্মান। পবিত্র কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যই হওয়া উচিত প্রধান শক্তি। কিন্তু বাস্তবতার মঞ্চে আজ মুসলিম দেশগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। এক পরাশক্তির সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে অন্যটি সহযোগিতার নামে এগিয়ে আসে—কিন্তু সেই সহযোগিতার আড়ালে থাকে সম্পদ ও প্রভাব দখলের সুদূরপ্রসারী নীল নকশা।

৫. বিভাজন ও নির্ভরশীলতার রাজনীতি।
মুসলিম বিশ্বকে ঘিরে এই শক্তিগুলোর কৌশল এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে দেশগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও গৃহযুদ্ধ লেগেই থাকে। প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর শক্তি ক্ষয় করা হয়। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো প্রতিবেশীদের মধ্যে ফাটল ধরানো এই কৌশলেরই অংশ, যাতে তারা সর্বদা এই পরাশক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং কখনো ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে না পারে।

উপসংহার: মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
দিন শেষে এই পরাশক্তিগুলোর বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতা—দুটোই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। রূপ আলাদা হলেও লক্ষ্য থাকে অভিন্ন—মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ও ভূ-খণ্ডে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা। তাই বর্তমান সময়ের দাবি হলো, মুসলিম দেশগুলোর নিজস্ব সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ব্লক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা, যাতে তারা কোনো শক্তির হাতের পুতুল না হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে।

★ হে মুসলিম উম্মাহ ও সচেতন বিশ্ববাসী!”
সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির এই দাবার ছক চেনার সময় আজ সমাগত। আমাদের অনৈক্যই তাদের শক্তির উৎস। আজ যখন আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং ধর্মের পবিত্রতা হুমকির মুখে, তখন বিভেদ ভুলে একতাবদ্ধ হওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
সজাগ হোন: পরাশক্তিগুলোর চাপিয়ে দেওয়া আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলুন।
ঐক্যবদ্ধ হোন: পাকিস্তান, আফগানিস্তান কিংবা ইরান—যেকোনো মুসলিম ভূখণ্ডে হামলা মানে পুরো উম্মাহর ওপর হামলা। আমাদের জাতীয় ও ধর্মীয় স্বার্থে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।
প্রতিরোধ গড়ুন: আধিপত্যবাদী শক্তির সামনে মাথা নত না করে নিজের দেশ ও ইসলামের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাহসী ভূমিকা রাখুন।

মনে রাখবেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা অন্যায়ের কাছে কখনো মাথা নত করেননি। আজ আমাদেরও সেই ঐতিহ্যের ধারক হতে হবে। ইসলামের বিজয় এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। ইনশাআল্লাহ, সত্যের জয় সুনিশ্চিত!

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 dailyainerkantho কারিগরি সহযোগিতায়ঃ BDITWork.com