প্রভাবশালীর দখলে যাচ্ছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স এর ৩৮১.৭৫ শতাংশ জমি?
মো: সাইফুল আলম সরকার, ঢাকা: হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স লিমিটেডের মিরপুরের গোড়ান-চটবাড়ি মৌজার ৩৮১ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার ৬ই অক্টোবর ২০২৬ইং বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এই দাবি জানান প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স লিমিটেড।
কোম্পানির দাবি, আদালতের আদেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করার পরও একাধিকবার দলবল নিয়ে ওই সম্পত্তিতে প্রবেশ করে দেয়াল ভাঙা, লোহার গেট স্থাপন, বাঁশ-টিন দিয়ে ঘেরাও এবং পরবর্তীতে স্থায়ী দেয়াল নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি করেও কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের সিইও ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. শামসুল আলমের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির বৈধ দখলে থাকা এই সম্পত্তি নিয়ে একটি পক্ষ আদালতের আশ্রয় নেওয়ার পরও আদালতের আদেশ অমান্য করে দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কোম্পানির দাবি, সম্পত্তিটি তাদের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের অর্থে ক্রয় করা এবং এর একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ভাড়ায় দেওয়া রয়েছে।
কোম্পানির নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মিরপুরের গোড়ান-চটবাড়ি মৌজার ৬৮০৪ ও ৬৬০৩ নম্বর দাগের মোট ৩৮১ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি ডিআরএ-এর অনুমোদন নিয়ে ক্রয় করে প্রাইম ইসলামী লাইফ। পরে যথাযথভাবে নামজারি ও খাজনা পরিশোধ করে সম্পত্তিটি ভোগদখল করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২০ সাল থেকে সম্পত্তির একটি অংশ টিভিএসের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রাইম ইসলামী লাইফের অভিযোগ, গত ২৯ এপ্রিল মো. আনিসুল ইসলাম ওরফে নাজমুলের নেতৃত্বে আক্তার জাহান (রাইসা সুলতানা) গং বাদী হয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৮ ধারায় মামলা করেন। মামলাটি ৪০/২৫ নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোম্পানির দাবি, মামলায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো সমন বা নোটিশ যথাযথভাবে জারি না করেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ থেকে একতরফা আদেশ দেওয়া হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে কোম্পানির পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা আদালতে ৮৪৩/২৬ নম্বর ফৌজদারি রিভিশন মামলা করা হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি হাইকোর্ট বিভাগে গড়ায়। কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৬ জুলাই ২০২৬ হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি বিবিধ মোকদ্দমা দায়ের করা হয়। এর টেন্ডার নম্বর ৬০৩২৪/২৬ এবং মামলা নম্বর ৪৬৮৭০/২৬; আদালত নম্বর অ্যানেক্স-৪।
কোম্পানির দাবি, শুনানি শেষে ২৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারির পাশাপাশি পরবর্তী আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। আদালতের ওই আদেশ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয় বলেও দাবি প্রতিষ্ঠানটির।
প্রাইম ইসলামী লাইফের অভিযোগ, হাইকোর্টের রুল ও স্থগিতাদেশ বহাল থাকার মধ্যেই ১ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আক্তার জাহান (রাইসা সুলতানা) গংয়ের লোকজন কোম্পানির সম্পত্তিতে প্রবেশ করেন। এ সময় জমির সুরক্ষায় নির্মিত দেয়াল ভেঙে লোহার গেট স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে বাঁশ ও টিন দিয়ে জমির একটি অংশ ঘেরাও করা হয় বলে অভিযোগ কোম্পানিটির।
ঘটনার পর ৬ আগস্ট অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি করা হয়। জিডির আবেদন ট্র্যাকিং নম্বর ঘঊঙএ-৩৯ বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এরপরও বিরোধ থামেনি বলে দাবি প্রাইম ইসলামী লাইফের। কোম্পানির অভিযোগ, ১৯ সেপ্টেম্বর মো. আনিসুল ইসলাম ওরফে নাজমুল কয়েকজন লোকজন নিয়ে কোম্পানির ভাড়াটিয়া টিভিএসের শেডে প্রবেশ করেন। সেখানে স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী মিঠুকে পরবর্তী এক-দুই দিনের মধ্যে স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ২২ সেপ্টেম্বর মিরপুর শাহ আলী থানায় ১২৮০ নম্বর সাধারণ ডায়েরি করে কোম্পানিটি। এর দুই দিন পর, অর্থাৎ ২৪ সেপ্টেম্বর, মো. আনিসুল ইসলাম ওরফে নাজমুলের নেতৃত্বে ৫০-৬০ জন লোক এবং নির্মাণসামগ্রী নিয়ে একটি দল ফের ওই সম্পত্তিতে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ করেছে প্রাইম ইসলামী লাইফ। কোম্পানির দাবি, তারা জোরপূর্বক স্থায়ী দেয়াল নির্মাণের কাজ শুরু করে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে শাহ আলী থানাকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয় ভূমি অফিসেও বিষয়টি জানানো হয়। তবে সেখান থেকেও দ্রুত কোনো কার্যকর নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির।
সিইও ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. শামসুল আলম বলেন, আদালতের আদেশ বহাল থাকার পরও যদি কোনো পক্ষ জোরপূর্বক সম্পত্তিতে প্রবেশ করে স্থাপনা নির্মাণ করে, তাহলে তা শুধু কোম্পানির সম্পত্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক বীমা গ্রাহকের স্বার্থও জড়িত।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, আদালতের আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। একই সঙ্গে ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনাসহ পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করা হোক। এ ঘটনায় শাহ আলী থানা পুলিশের ভূমিকা কী ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
কোম্পানির পক্ষ থেকে আরো অভিযোগ করা হয়েছে, মো. আনিসুল ইসলাম ওরফে নাজমুল নিজেকে স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আনিসুল ইসলাম ওরফে নাজমুল কিংবা আক্তার জাহান (রাইসা সুলতানা) গংয়ের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স কর্তৃপক্ষ বলছে, জমির মালিকানা, আদালতের আদেশ এবং ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনাসহ পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন এবং কোম্পানির সম্পত্তি ও গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।