পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা নির্ধারণসহ যেসব দাবি জানায় সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন

মো: সাইফুল আলম সরকার, ঢাকা: বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও ন্যায়সংগত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানের অবসান, ন্যায়সংগত মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন (SGSF)।
একই সঙ্গে অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, ঠিকাদারি ও সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থায় নিয়োজিত শ্রমিকদের পূর্ণ শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আওতায় আনা, পরিচর্যা কর্মীদের ন্যায়সংগত মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং গিগ ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের ন্যায্য কর্মঘণ্টা, পারিশ্রমিক ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংগঠনটি।

বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস উপলক্ষে ৭ অক্টোবর সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সমাবেশে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, আওয়াজ ফাউন্ডেশন এবং পোশাকশ্রমিক উন্নয়ন জনকল্যাণ সংস্থার যৌথ উদ্যোগে ফেডারেশন নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক, শ্রমিক নেতা ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

সমাবেশে এস জি এস এফ এর সাধারন সম্পাদক খাদিজা আক্তার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পোশাকশিল্প। এই শিল্পের শ্রমিকদের শ্রম ও অবদানের ওপর দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে থাকলেও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনও অপর্যাপ্ত মজুরি, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষার অভাব এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, ঠিকাদারি, সাব-কন্ট্রাক্টিং ও অন্যান্য পরোক্ষ নিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করা শ্রমিকরা চাকরির নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা এবং শ্রমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বক্তারা বলেন, একজন শ্রমিক যদি নিয়মিত ও পূর্ণকালীন কাজ করেন, তাহলে তাঁর নিয়োগের ধরন বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়োগের কারণে তাঁকে নিয়মিত কর্মীর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

ঠিকাদার, সাব-কন্ট্রাক্টর বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগের অজুহাতে মূল নিয়োগকর্তাকে শ্রমিকের প্রতি তাঁর আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। শ্রমিকের অধিকার ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মূল নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। বক্তারা বলেন, শ্রমিকের মজুরি এমন হতে হবে, যা শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারে। পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নিয়মিত পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
সকল শ্রমিকের জন্য নিয়োগপত্র, কর্মপরিচয়পত্র, সামাজিক সুরক্ষা ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বক্তারা বলেন, শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ধরন কোনোভাবেই তাঁর মৌলিক শ্রম অধিকার খর্ব করার কারণ হতে পারে না।
কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা (Occupational Safety and Health—OSH) শোভন কাজের অন্যতম মৌলিক শর্ত উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, প্রতিটি পোশাক কারখানা ও কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সুরক্ষা উপকরণ, প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা মালিক ও নিয়োগকর্তার দায়িত্ব।

নারী শ্রমিকসহ সকল শ্রমিকের জন্য সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও জেন্ডারভিত্তিক হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা আইএলও কনভেনশন ১৯০ বাস্তবায়নের দাবি জানান। কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিকারের জন্য কার্যকর, নিরাপদ, নিরপেক্ষ ও শ্রমিকবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, পরিচর্যা কর্মীদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি, ন্যায়সংগত মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গিগ ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের ন্যায্য কর্মঘণ্টা, ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মজীবী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, সহজলভ্য ও নিরাপদ ডে-কেয়ার সুবিধা নিশ্চিত করাকেও শোভন কর্মপরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের দাবি: বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস উপলক্ষে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সরকার, মালিক ও নিয়োগকর্তা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি দাবি জানায়—
• শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে বাঁচার মতো মজুরি (Living Wage) প্রদানের দিকে কার্যকরভাবে অগ্রসর হতে হবে;
• পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে;
• অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ (Precarious) কর্মসংস্থানের অবসান ঘটাতে হবে;
• অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে হবে;
• নিয়মিত ও পূর্ণকালীন কাজ করা অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, ঠিকাদারি ও পরোক্ষভাবে নিয়োজিত শ্রমিকদের পূর্ণ কর্মসংস্থান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে;
• সকল শ্রমিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে;
• প্রত্যেক শ্রমিককে নিয়োগপত্র ও কর্মপরিচয়পত্র প্রদান করতে হবে;
• প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা (OSH) নিশ্চিত করতে হবে;
• আইএলও কনভেনশন ১৯০ বাস্তবায়ন করে কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও জেন্ডারভিত্তিক হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে;
• শ্রমিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের জন্য নিরাপদ, কার্যকর, নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
• সকল শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে;
• পরিচর্যা কর্মীদের ন্যায়সংগত মজুরি, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে;
• গিগ ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের ন্যায্য কর্মঘণ্টা, মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে;
• কর্মজীবী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য ডে-কেয়ার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে; এবং
• ঠিকাদার, সাব-কন্ট্রাক্টর বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়োগের অজুহাতে মূল নিয়োগকর্তাকে শ্রমিকের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

সমাবেশ থেকে বক্তারা বলেন, শোভন কাজ কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি শ্রমিকের অধিকার। কর্মসংস্থানের ধরন দিয়ে শ্রমিকের অধিকার নির্ধারণ করা যাবে না। একজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করলে তাঁকে নিয়মিত কর্মসংস্থানের স্বীকৃতি, ন্যায়সংগত মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে টেকসই ও শ্রমিকবান্ধব করতে হলে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। তাই সরকার, মালিক ও নিয়োগকর্তা, শ্রমিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, ঠিকাদারি, সাব-কন্ট্রাক্টিং, পরিচর্যা, গিগ ও প্ল্যাটফর্মসহ সকল শ্রমিকের জন্য শোভন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন।