২৯ অক্টোবর ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাওয়ের ঘোষণা এনআরসির

মো: সাইফুল আলম সরকার, ঢাকা: ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদেড় ঘরবাড়ি ও মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা পরিকল্পিত ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত নির্মূলে রূপ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ভারতের প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। চার দেশের উচিত জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারতের ওপর কঠোর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ ও স্যাংশন (অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা) আরোপের জোরালো আহ্বান জানানো।

২২ অক্টোবর ২০২৬ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ভারতের আসাম রাজ্যে সম্প্রতি ১১ শত মুসলিম পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ এবং ১০টি মসজিদ ধ্বংস করার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ-এনআরসি এ দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশে ভারত নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে ও দেশটির হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী কূটনৈতিক প্রটোকল না মেনে প্রভাব বিস্তার করে অভিযোগ করে তাকে বহিষ্কারের দাবিতে আগামী ২৯ অক্টোবর হাইকমিশন ঘেরাও করবে বলেও দলটি ঘোষণা দিয়েছে।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে দলের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান বলেন, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ-দুটিরই পতন হয়েছে। কিন্তু ভারত জুলাই বিপ্লব থেকে কোনো শিক্ষা না নিয়ে আবারো আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী ভাইসরয়ের মতো তৎপরতা চালিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের তৎপরতা আর বরদাশত করবে না। আগামী ২৯ অক্টোবর হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে বহিষ্কারের দাবিতে হাইকমিশন ঘেরাও করে জবাব দেবে।

ভারতে মুসলিম নির্যাতনের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যখন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় নিরাপদে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দুর্গা পূজা উদযাপন করেছে তখন আসামে সংখ্যালঘু বাঙালি মুসলমানদের এগারো শতেরও বেশি ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দশটি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। এর আগে গত বছরও পাঁচটি বড় ধরনের উচ্ছেদ চালিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাঙালি মুসলমানের বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়েছিল। সে সময়ে কয়েক শত ভারতীয় মুসলমানকে জোরপূর্বক সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ভারতে মুসলিম নিপীড়ন ও উচ্ছেদ কোনো বিচ্ছিন্ন বা মামুলি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়। আসাম ও উত্তর প্রদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল এবং এটি গণহত্যার দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট সংকেত। মুসলিমদের সুপরিকল্পিতভাবে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভারতে বড় ধরনের সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে।

এনআরসি আহ্বায়ক বলেন, ভারতে মুসলিম গণহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সেখানে আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে মুসলিম জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এথনিক ক্লিনজিংয়ের চালানো হচ্ছে। আসাম ও উত্তর প্রদেশে এ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক সব ধাপ দৃশ্যমান হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী জোরপূর্বক উচ্ছেদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভারত এই চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ হয়েও জোরপূর্বক মুসলমানদের উচ্ছেদ করছে। এ অবস্থায় ভারতের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।

সমাবেশে এনআরসি সদস্য সচিব ডা. নাবিল আহমদ বলেন, আজ আসামের কোনো এক মা হয়তো ভাঙা দেয়ালের পাশে বসে তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে আছেন। তার মাথার ওপর ছাদ নেই, কিন্তু আসমান আছে। আর সেই আসমানের মালিক আল্লাহ, যিনি জালিমকে ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। আমরা ঢাকা থেকে আসামের সেই মাকে বলতে চাই: আপনি একা নন। আপনার কান্না আমরা শুনেছি। আপনার পক্ষে আমরা কথা বলব, যতদিন না ন্যায়বিচার আসে।

এ সময় তিনি চার দফা দাবি তুলে ধরেন। এরমধ্যে রয়েছে- অবিলম্বে আসামে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ এবং উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জন্য জরুরি আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা প্রদান করতে হবে; উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোকে যথাযথ পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, এবং ভেঙে ফেলা মসজিদগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হবে; বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের সরকারকে কূটনৈতিক পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানাতে হবে; জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত দল প্রেরণ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করতে হবে।

এনআরসি সহকারী সদস্য সচিব আব্দুস সালাম তার বক্তৃতায় বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাম্বলীরা সম্প্রীতির সঙ্গে পূজা উদযাপন করছে। কিন্তু আমরা দেখছি পশ্চিমবঙ্গ আসামসহ সমগ্র ভারতে মুসলমানদের ওপর জাতীগত নিধন চলছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের উচিত ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করা। ভারত যদি মুসলিম নিপীড়ন বন্ধ না করে তাহলে ভারতীয় হাইকমিশনারকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা।

বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহবায়ক আবদুল ওয়াহেদ বলেন, আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে মুসলমানসহ সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নীতিগত ও কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করুন। মানবাধিকারের প্রশ্নে নীরবতা নয়, কঠোর ও দায়িত্বশীল কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।তিনি বাংলাদেশের জনগণকে আহবান জানিয়ে বলেন, ভারতে মুসলমানদের উপর যে নির্মম নির্যাতন হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সজাগ হোন, বাংলাদেশ সরকারকে ভারতে মুসলমানদের উপর নির্যাতন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করুন।

সমাবেশে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমির চেয়ারম্যান মো. আবদুল জব্বার, প্যান ইসলামিক মুভমেন্টের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মোস্তফা জামাল ভূঁইয়া, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাইয়েদ কুতুব, কেন্দ্রীয় সদস্য মো. সাইদুল ইসলাম, সাকিব সামিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোঃ আলমগির হোসেন প্রমুখ।