
একটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য আরেকটি মামলায় shown arrest দেখানো কতটুকু আইন সঙ্গত বা যুক্তিযুক্ত?
হ্যাঁ, আইনের দৃষ্টিতে শোন এরেস্ট দেখানোর বৈধতা আছে যদি জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্বেই একাধিক মামলা রুজু থাকে এবং তৎমূলে ওয়ারেন্ট বা যুক্তিযুক্ত কারণ থেকে থাকে।
কিন্তু সেটা যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা হেনস্তার উদ্দেশ্যে নতুন করে মামলা রুজু করা হয়ে থাকে, তবে সে ব্যক্তি একটি আইনী আপেক্ষিকতায় আদালতের আশ্রয় লাভের অধিকারী।
আদালত একটি সুনির্দিষ্ট মামলায় কোনো ব্যক্তিকে Custodial Bail মঞ্জুর করলো এবং তদানুযায়ী রিলিজ আদেশ কারাগারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট পৌছালোও বটে কিন্তু আসামী বের হতে অযৌক্তিক সময়ক্ষেপন হচ্ছে।
ওদিকে কারাগারের ফটকের বাইরের বোর্ডে নোটিশ টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে আজকে কারা কারা কারাগার থেকে বের হবে। সেটা দেখে আস্বস্ত হয়ে আশায় বুক বেঁধে ওই জামিনপ্রাপ্ত আসামীর ঘনিষ্ঠজনেরা কারাগারের ফটকে চাতক পাখির মতো পথ চেয়ে আছে। কিন্তু দেরি হচ্ছে বলে এক অজানা দুশ্চিন্তা তাদের উপর ভর করেছে। এদিকে ওদিকে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আতঙ্ক নিয়ে জিজ্ঞেস করছে দেরি হওয়ার কারণ নিয়ে। কেউ আবার বলে ফেললো যে, দেখেন গিয়ে আরেক মামলায় শোন এরেস্ট দেখিয়ে দিলো কি না।
কিছুক্ষণ পরে জানা গেল যে, উক্ত আসামীর বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দিয়ে শোন এরেস্ট / shown arrest দেখিয়ে আজকে কারামুক্তি দেওয়া সম্ভব না।
আসামীর ঘনিষ্ঠজনদের বুকে যেন কেউ শেল ছুরে মেরে দিলো। নিরবে চোখের জল ফেলে তারা বার বার কারাগারের দিকে পেছন ফিরে ফিরে কি যেন দেখে দেখে অন্ধকারের পথে বাড়ির ঠিকানায় রওয়ানা হয়।
বাসায় গিয়ে সময়ের সাথে সাথে নিজেদের দুর্ভাগা বলে মানিয়ে নিতে থাকে। কিন্তু সময় যাওয়ার সাথে সাথে তাদের ভিতরে একটি যৌক্তিক প্রশ্নের উদয় হয়- আচ্ছা, নতুন মামলায় যদি গ্রেপ্তার দেখাবে তাহলে আমাদের এতগুলো টাকা জজ কোর্ট আর হাইকোর্টে খরচ হলো সেটার কি হবে এবং হাইকোর্টের আদেশের কি দাম রইলো?
(প্রশ্নগুলো বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য বিস্তারের একটি নমুনা নয়, বর্তমানের একটি চূরান্ত বাস্তবতা।)
উনারা চাইলো আর নতুন মামলা দিয়ে ভিতরে রেখে দিলো। হাইকোর্টের দাম রইলো কই।
কালা বাদশার (ছদ্ম নাম) ষড়যন্ত্রের কাছে হাইকোর্টও ব্যর্থ? কালা বাদশা আবারো মামলা দিয়ে দিলো?
আর টাকা খরচ করে কি লাভ? আবার জামিন করাবো আবারও এরেস্ট দেখাবে। কোথায় যাবো তাহলে? বাচ্চাগুলো নিয়ে ভাই-বাপের কাছে কতদিন থাকবো?
– একজন আইনজীবী তার আসামীর স্ত্রীর চোখের পানি দেখে চুপচাপ হয়ে রইলো। আইনজীবী সাহেবই কি করবে?
বিনা বিচারে দিনের পর দিন একজন ব্যক্তিকে পেশি শক্তির বলে জেলের ভিতরে আটকে রাখার এই সংস্কৃতি একটি নিরীহ – গরিব পরিবারের জন্য একটি সাক্ষাৎ খড়গ।
এর চেয়েও নিকৃষ্ট গল্প আমাদের জানা আছে। কিন্তু সেগুলো সাধারনের গোচরীভূত হওয়া অসম্ভব।
আইনী পথে উপায় কি?
উপায় আছে। যদি নতুন মামলার গ্রাউন্ড নিয়ে আপনার নিকট সন্দেহ থাকে অথবা যদি মনে হয় একই বিষয়ে একাধিক মামলা করা হচ্ছে বা রাজনৈতিক উদ্দশ্য প্রণোদিত মনে হয়, তাহলে যথাযথ কারণসমূহ একিভূত করে একজন দক্ষ আইনজীবীর দ্বারস্থ হয়ে আপনি আপনার মৌলিক অধিকার বা সংবিধানের আর্টিকেল ৩৩ এর লঙ্ঘনের দায়ে আর্টিকেল ১০২ এর উপর ভর করে হাইকোর্টে গিয়ে একটি রিট মামলা করে দায়ের এই সমূহ বিপদ থেকে প্রতিকার পেতে পারেন।
এছাড়াও যদি কখনো আপনার জানা থাকে যে, আপনার বিরুদ্ধে আরো ষড়যন্ত্রমূলক মামলা রুজু আছে বা করা হচ্ছে, তাহলে সেটার জন্য আপনি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়েও নিতে পারেন। সেটা আপনি জেল হাজতে থাকাবস্থায়ও নিতে পারবেন, আইনী বাধা নাই।
“If a person has reason to believe that he may be arrested in a second or subsequent case, he has the right to seek anticipatory bail even while in custody in a different case.”
—- Md. Hanif vs. State; 56 DLR (AD) 201.
মোদ্দাকথা, বাংলাদেশের মতো জনাকীর্ণ দেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলের পৈশাচিক হস্তক্ষেপের মুখে এ ধরনের অ-আদালতীয় অনেক শব্দের আবির্ভাব বিচার বিভাগের সামনে এসেছে। এসকল বিষয়ের উপর দেশের রাজনৈতিক ও ক্ষুদ্র স্বার্থান্বেষী মহলের প্রেক্ষিত বিচারে নিয়ে বিচার বিভাগের একক পদক্ষেপ গ্রহণ করতঃ নিজস্ব একটি সুনির্দিষ্ট অবয়ব তৈরি করা জরূরী।
নইলে আইনের জটিল ফাঁকে পুঁজিবাদীর দল ও নব্য এলিটেরা তাদের টাকার ঝনঝনানি দিয়ে বড় আইনজীবীর সহায়তায় নিজেরা বেঁচে ফিরলেও কালা বাদশাহদের মতো পাপীষ্ঠদের থাবা থেকে সাধারণ মানুষের জীবন সেই মধ্যযুগীয় দাসজীবনই রয়ে যাবে।
——————————
কে এম ওমর সিদ্দিক
আইনজীবী
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা।
advocateomar23@gmail.