
আইনজীবীর NOC (No Objection Certificate) নিয়ে একটি ছোট্ট পর্যালোচনা।।
(অধস্তন আদালতে এনওসি নিয়ে কতিপয় আইনজীবীদের দৃষ্টিকটু আস্ফালন ; সেখানে এনওসি নিয়ে বিচার বিভাগের এখতিয়ার কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত??)
—————————————————————————-
এনওসি নিয়ে আমার সাথে এ পর্যন্ত প্রায় ৫/৬ টি দৃষ্টিকটু ঘটনা ঘটেছে।
একটি এমন-
বিজ্ঞ আদালতের কলে আসামীর উপস্থিতে জামিন শুনানী করার জন্য আমার ওকালতনামা ও জামিনের দরখাস্ত নথিতে আগেই দেওয়া আছে।
শুনানীর জন্য মামলা কল হলে হঠাৎ করে একজন সিনিয়র লার্নেড এসে নথি না দেখেই তার ওকালতনামা ও জামিনের পিটিশন দিয়ে আচমকা শুনানী শুরু করে দিলেন। আমি তো চুপ হয়ে গেলাম। কিন্তু তার সিনিয়রিটির সম্মানে ভরা কোর্টে তাকে অপমান করলাম না। পরে শুনানীতে আমি নিজেকে জড়ালাম।
জামিন মঞ্জুর হলে ঘটনার বিড়ম্বনা এড়াতে উপস্থিত অন্যান্য কিছু পরিচিত সিনিয়র আইনজীবীদের সামনেই সংশ্লিষ্ট কোর্টের দ্বারস্থ হতেও বাধ্য হয়েছি। সেখানে বিজ্ঞ আদালত নিজে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং আমি অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছি।
এরকম ঘটনা একাধিক ঘটেছে কিন্তু প্রতিবারই সিনিয়রদের সম্মান করেছি। বিনিময়ে আমি যথাযথ সম্মানীও পাই নাই।
সর্বশেষ-
গতদিন নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় একজন আইনজীবীর ওকালতনামা নথিতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো প্রায় ২ বছর আগে। এর মধ্যে মামলাটির চার্জশিট এসেছে, মামলা বদলী হয়েছে, চার্জ গঠন হযেছে, এখন সাক্ষীর জন্য রেডি বা বিচারের জন্য দিন ধার্য হয়ে গেছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য উক্ত লার্নেড এই মামলা পরিচালনার দ্বায়িত্ব নিয়ে মাত্র ৩ টি শুনানী করেছেন, সেটাও দুই বছর আগে। আসামী বিনা তদ্বিরে আজ দুই বছর জেল হাজতে।
এই মামলায় আমাকে নতুন করে দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আসামী পক্ষ উক্ত আইনজীবীর নিকট থেকে এনওসি আনতে নারাজ। আমিও বললাম যে, এনওসি ব্যতিত আমি দ্বায়িত্ব নিতে পারবো না। এমতাবস্থায় আসামী পক্ষ আমাকে বিকল্প খুঁজতে বললো।
আমি বার সমিতিতে জানানোর কথা বললাম তাতেও তারা রাজি নয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের নিকট উক্ত আইনজীবীর অসহযোগিতা, গাফলতি ও দ্বায়িত্বহীনতার কথা উপস্থাপন করার পরামর্শ দিলাম। উনারা ঘাবড়িয়ে গেলেন।
আমি বললাম, বলেন, কাজ হবে।
আমার কথামতো তারা সাহস করে বললো।
বিচারক মহোদয় নথি পর্যালোচনা করে দেখে আমার ওকালতনামা দাখিল করার আদেশ দিলেন এবং বললেন, আগের আইনজীবী হাজতী আসামীর মৌলিক অধিকার বলবৎকরণে শুধু অসহযোগিতা নয়, প্রকারান্তরে বাধা হয়েও ছিলেন।
একটু গল্প আছে এখানে। এটা আইনী গল্প। সাংবিধানিক গল্প। সেটা ওদের পাশাপাশি কোর্ট আমাকেও জিজ্ঞেস করায় পাই পাই করে বলেছি। এরপর কোর্ট আমার যুক্তির একটু প্রশংসা করলেন।
আমিও উক্ত আদালতের প্রতি সন্তুষ্ট তাঁর এমন সাহসী সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য।
আমি কি বলেছিলাম?
সেটাই বলছি। যদিও পুরোটা বলার সুযোগ হয় নি কিন্তু আমার নোটে প্রতিটি আইনী বিষয়ের টাচ ছিলো।–
১। সংবিধানের আর্টিকেল ৩১ এর Right to protection of law এবং ৩৫ এর Protection in respect of trial এর কথা বলেছি, যা মৌলিক অধিকার রূপে ঘোষিত।
২। CrPC এর সেকশন ৩৪০(১) বলা আছে, Any person accused of an offence before a criminal court may of right be defended by pleader. এখানে এনওসি’র কথা বলা নাই।
৩। CrPC এর সেকশন ৫৬১এ তে দাড়িয়ে শত শত সিদ্ধান্তে ন্যায় বিচারে গাফলতি ও অসহযোগিতা বিষয়ে মহামন্য হাইকোর্ট তলবানা দিয়েছেন।
৪। স্টেট বনাম রাম নরেশ পান্ডে মামলায় ( AIR 1962 SC 876) ইন্ডিয়ান সুপ্রিমকোর্ট বলেছেন, Right to be defended by a counsel of his choice is fundamental.
– উপরিউক্ত আইনী বাধ্যতায়, আইনের আশ্রয় লাভের মৌলিক অধিকার বলবৎ করণে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ও প্রশ্নাতীত বিচারিক কার্যক্রম শেষ করতে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক নিযুক্তীয় আইনজীবীর সুস্পষ্ট গাফলতি ও অসহযোগিতার বিষয় আমলে নিয়ে নতুন কোনো আইনজীবী নিয়োগের আদেশ দানে সাংবিধানিকভাবে শুধু এখতিয়ার চর্চাকারী নয়, বাধ্যও বটে।
সেখানে পূর্বোক্ত আইনজীবীর এনওসি জরূরী নয়।
পক্ষান্তরে, আসামী জেল হাজতে থাকাবস্থায় নিযুক্তীয় আইনজীবীর মামলা পরিচালনার গাফলতি বার সমিতির বিধান পরিপন্থী।
এছাড়াও যদি কোনো মামলায় আইনজীবী নিযুক্ত থাকার পরেও বিনা তদ্বিরে বিচারিক ধাপ স্পর্শ করে তাহলে আদালত পাড়ার কাস্টম অনুযায়ী সেই আইনজীবী ওই মামলায় জোরপূর্বক মামলা পরিচালনায় যোগ্য নন বা তার এনওসি জরুরী নয়।
কিন্তু একজন আইনজীবী নিয়োগ করে, তাকে তার প্রচেষ্টার সুযোগ না দিয়ে এবং যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করে ভিন্ন আইনজীবী তালাশ করা এবং তাকে অপদস্ততার জন্য বার সমিতি ও বার কাউন্সিল আছেন। সেটা ভিন্ন বিষয়।
অবশ্য সেখানেও আমাদের কিছু আইনজীবী আছেন যাদের কারণেই এরকম ঘৃণ্য পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যার জন্য খোদ আইন পেশার কপালে কালিমা লেপন হচ্ছে, আইনজীবীরা সাধারণ মানুষের দ্বারা বদনাম কামাচ্ছে।
– কে এম ওমর সিদ্দিক, আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা।