
কুমিল্লায় ৮ মাসে সড়কে ঝরেছে ১৪১ প্রাণ, পদুয়ারবাজারেই ২০ জন
মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে কুমিল্লার সড়ক-মহাসড়কে। গত ৮ মাসে জেলার সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪১ জন। এই সময়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘটা ২০৯ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আড়াই শতাধিক মানুষ। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৪০টি। হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়ন কার্যালয় থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
হাইওয়ে পুলিশ বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় জানুয়ারি মাসে নিহত হয়েছেন ১৬ জন, ফেব্রুয়ারি ১৬ মাসে জন, মার্চ ১০ মাসে জন, এপ্রিল মাসে ২২ জন, মে মাসে ২০ জন, জুন মাসে ২৫ জন, জুলাই মাসে ১৮ জন, আগস্ট মাসে ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু পদুয়ারবাজার ইউটার্নেই গত ৮ মাসে ১৭ দুর্ঘটনায় অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
অতিরিক্ত গতি, উল্টোপথে চলাচল, অসচেতন পথচারী পারাপার, বেআইনিভাবে ইউটার্ন এবং ভাঙ্গাচুরা সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে হাইওয়ে পুলিশের বিশ্লেষণে উঠেছে এসছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যাত্রীবাহী ও ভারী যানবাহনের সংঘর্ষের পৃথক ঘটনায় একই সময়ে একাধিক প্রাণহানি হলেও এককভাবে দ্রুতগতির মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।
শুধুমাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১০৪ কিলোমিটার, কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে ৬৬ কিলোমিটার ও কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের ৪৮ কিলোমিটারই নয়; দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে জেলার বিভিন্ন প্রধান প্রধান সংযোগ সড়কেও। যদিও মহাসড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর খবর আলোড়ন সৃষ্টি করে কয়দিন পরপর।
হাইওয়ে পূর্বাঞ্চলের পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘মহাসড়কের সংজ্ঞায় আমাদের মহাসড়ক নেই। মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি সড়কগুলোকেও পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করতে হবে। দিন দিন যে পরিমাণ যান চলাচল ও পথচারী পারাপার বাড়ছে, তা মাথায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। আমরা হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে গতি নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেস বিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ ও থ্রি হুইলার নিয়ন্ত্রণে কাজ করে থাকি। আমাদের যে জনবল আছে সে জনবল দিয়ে যতটুকু সম্ভব সবটুকুই চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
জানা গেছে, সবশেষ চলতি মাসের ২২ আগস্ট চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সামনে ইউ টার্নে যাত্রীবাহী প্রাইভেট কারের ওপর লরি ছিটকে পড়ে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়। রাজধানী ঢাকায় ছেলের বাসা থেকে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার হোসেনপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে যাবার সময় ওই দুর্ঘটনায় নিহত হন ওমর আলী, তাঁর স্ত্রী নুরজাহান বেগম ও দুই ছেলে হাশেম এবং কাশেম।
দুর্ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, পদুয়ার বাজারের পূর্ব দিকের চট্টগ্রামমমুখী লেন থেকে ঢাকামুখি লেনে যেতে অপেক্ষা না করেই চলাচলের সময় ঢাকামুখী লেনে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি হানিফ পরিবহনের বাসের মুখোমুখি হয় যাত্রীবাহী প্রাইভেট কার। একই সময় ঢাকামুখী লেনেই গতি সম্পন্ন একটি লরি প্রাইভেট কার ও বাসটির সামনে এসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাইভেট কারটির পেছনের দিকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা লেগে প্রাইভেট কারটির সম্মুখভাগ ঘুরে যাওয়ার সময় লরিটি কনটেইনারসহ প্রাইভেট কারের ওপরে পরে। এ সময় ইউটার্নে অপেক্ষারত আরেকটি সিএনজি অটোরিকশার ওপরও লরির সামনের অংশটি চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইউটার্নটিতে এসে প্রাইভেট কারটি আরও সচেতনভাবে পারাপার লক্ষ্য করা যায়নি। অপর দিকে বাসটি উল্টোপথে এসে নিরবিচ্ছিন্ন যান চলাচলে বাধা দেয়। আর এতেই গতি নিয়ে আসা লরিটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। তবে বাস যে পাশ দিয়ে আসছিল, সে দিকে ইউলুপের কাজ চলমান থাকায় খানাখন্দ এড়াতে গিয়ে অনেকটা সড়কের মাঝখানে চলে এসেছিল।
সড়ক দুর্ঘটনারোধে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা ‘নিরাপদ চালক চাই’ এর অন্যতম সংগঠক ও মানবাধিকারকর্মী আবদুল হান্নান বলেন, ‘প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা হচ্ছে। মহসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যথাযত পদক্ষেপ ও সঠিক আইন না মেনে গাড়ি চালানো এবং আইনের প্রযোগের প্রচণ্ড অভাবের কারণে এসব দুর্ঘটনা হয় বলে আমি মনে করি। যখনই দুর্ঘটনা ঘটে মিডিয়ায় আসে, তখন ঊর্ধ্বতন কৃর্তৃপক্ষ নড়েচরে বস। সাময়িক তদারকি করে, এর কিছুদিন পর আবার সব নীরব হয়ে যায়। এটা আমাদের দূর্ভাগ্য যত্রতত্র অধৈর্য নিয়ে গাড়ি চলানোর প্রতিযোগিতা, অদক্ষ চালক ও অসচেতনতার কারণে দুঘটনা বাড়ছে। বিশেষ করে কুমিল্লা জেলায় বিভিন্ন সড়কে দুর্ঘটনা প্রতিদিনে আহত ও নিহত হচ্ছে মানুষ। এর প্রতিকার চাই। পরিকল্পিত মহাসড়ক এবং সচেতন যাত্রী ও চালক হলে দুর্ঘটনা সড়ক ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্টদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে।’
হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘মহাসড়কে সংজ্ঞায় মহাসড়ক যেমন থাকার কথা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এরকম নেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ি চলছে কিন্তু অন্য যে গাড়িগুলো ছোট গাড়িগুলো, লোকাল পরিবহন, থ্রি হুইলার গাড়িগুলো চলবে, যেগুলো এলাকার মানুষের চাহিদা অনুযায়ী চলে, এগুলো চলার জায়গা নেই। মহাসড়কের এপাড়ের মানুষ নিত্য কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য শহরে আসে, আবার শহরের লোকজন আবার বাইরে যাচ্ছে, কিন্ত যাওয়ার জন্য আন্ডারপাস ওভারপাস অথবা মহাসড়কের দুপাশে যে বিশেষ সার্ভিস লেন থাকার কথা সে সার্ভিস লেন নেই। তারপর হোটেলে যাওয়ার জন্য যে ইউটার্নগুলো বানানো হয়েছে সেগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। ইউটার্ন রাখলে যারা সেখানে হোটেল ব্যবসা করে তাদের হয়তো ব্যবসায় সফলতা আসছে, কিন্তু লোক মারা যাচ্ছে, এটা আমাদের দেখতে হবে। যে ডিপার্টমেন্ট এই ইউটার্ন বন্ধের দায়িত্বে আছে, বিশেষ করে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে এটা নিশ্চয়ই বন্ধ করবে। এগুলো বন্ধ করলে অন্তত এই জায়গা থেকে আর দুর্ঘটনা ঘটবে না বলে আমি মনে করি।’