
বিশেষ প্রতিবেদন:
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে আলোচিত সাংবাদিক ও ইউটিউবার নাজমুস সাকিবের লেখায় এসবি প্রধান গোলাম রসুলকে ঘিরে যে অভিযোগের পাহাড় তৈরি করা হয়েছে, তার অধিকাংশই ভিত্তিহীন, কল্পনাপ্রসূত এবং প্রমাণবিহীন। ৫ ফেব্রুয়ারি ‘জামায়াতের অপকর্মের সহচর এসবি প্রধান গোলাম রসুল’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই লেখাটি বিশ্লেষণ করলে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, নাকি পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাহিনী ও আসন্ন নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা?
মুজিব বর্ষ নিয়ে উদ্ভট দাবি: তথ্য কোথায়, প্রমাণ কী?
নাজমুস সাকিবের সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ—মুজিব বর্ষ পালনের ধারণা নাকি এসেছে এসবি প্রধান গোলাম রসুলের মাথা থেকে। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত ও সর্বস্তরে পালিত এই কর্মসূচি নিয়ে কোথাও, কখনো, কোনো দায়িত্বশীল মহল এমন দাবি করেনি। সরকারি নথি, বক্তব্য কিংবা ইতিহাসের কোথাও এই তথ্যের অস্তিত্ব নেই।
প্রশ্ন উঠছে—কোনো দলিল, সাক্ষ্য বা বিশ্বাসযোগ্য সূত্র ছাড়া এমন একটি জাতীয় কর্মসূচিকে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করার সাহস নাজমুস সাকিব পেলেন কোথা থেকে?
সুবিধাভোগী না বঞ্চিত? গোলাম রসুলের বাস্তব চিত্র আড়াল কেন
লেখায় দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার আমলে গোলাম রসুল সব সুবিধা নিয়েছেন। বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সে সময় পদোন্নতিতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের তালিকায় গোলাম রসুল ছিলেন শীর্ষে। তার জুনিয়ররা একের পর এক পদোন্নতি পেলেও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি অবহেলিতই থেকে যান।
এই বাস্তবতা জানার পরও নাজমুস সাকিব যদি সুবিধাভোগীর তকমা লাগান, তবে তার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
‘নৌকার মাঝি’ থেকে ‘জামায়াতি’—অশালীন ভাষায় সাংবাদিকতা?
গোলাম রসুলকে ‘নৌকার মাঝি’ কিংবা ‘লুঙ্গির তলা থেকে বের হয়ে জামায়াতি পরিচয় দেওয়া’—এ ধরনের শব্দচয়ন একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের ন্যূনতম পেশাগত মানের সঙ্গেও যায় না। অভিযোগ গুরুতর হলে তার পক্ষে প্রমাণ দিতে হয়—গালাগাল নয়।
আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও করা হয়েছে প্রমাণ ছাড়াই। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য থাকলে তা প্রকাশ করার দায় নাজমুস সাকিবেরই।
ড. ইউনূস, যুক্তরাষ্ট্র ও ‘ব্লুপ্রিন্ট’: কে বলেছে, কাকে বলেছে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশে নাজমুস সাকিব লিখেছেন—এসবি প্রধান গোলাম রসুল ও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম নাকি মনে করেন, ড. ইউনূস ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্লুপ্রিন্টে’ নির্বাচনে জামায়াতকে জয়ী দেখানো হবে।
প্রশ্ন হলো—এই বক্তব্য কি তারা সত্যিই দিয়েছেন? যদি না দিয়ে থাকেন, তবে নাজমুস সাকিব কি নিজেকে এসবি বা ডিবি প্রধানের চেয়েও বড় ‘অন্তর্যামী’ মনে করছেন? এসবি বা ডিবি প্রধানের পদ কি এমন যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিকল্পনা তাদের সঙ্গে আলোচনা হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের একমাত্র উদ্দেশ্য—দুই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করা এবং একই সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
মানব পাচারের অভিযোগ: তালিকা কোথায়, মামলা কোথায়?
কিউ-ওয়ান ভিসা ক্যাটাগরিতে মানব পাচার ও আদিবাসী নারীদের পাচারের অভিযোগ করে নাজমুস সাকিব বলেছেন—পাঁচ লাখ টাকা করে হাজারেরও বেশি নারী পাচার হয়েছে।
প্রশ্ন সহজ—এই হাজারের বেশি নারীর তালিকা কোথায়? মামলা নম্বর কোথায়? তদন্ত প্রতিবেদন কোথায়? প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ কেবল ভিউ বাড়াতে পারে, সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের গল্প: গুজব না তথ্য?
বাংলাদেশ-চীনের জয়েন্ট পার্টনারশিপের ব্যবসা ‘মাসুদের নিয়ন্ত্রণে’—এমন অভিযোগও আনা হয়েছে প্রমাণ ছাড়াই। মাসুদ দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী—যা অনুসন্ধান করলেই জানা যায়। কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী কি আদৌ এভাবে ব্যক্তির আতঙ্কে চলে? নাজমুস সাকিব চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যপ্রণালি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নিতে পারতেন।
পুলিশ পুনর্গঠনের লড়াইয়ে অপপ্রচার কেন এখনই?
৫ আগস্টের পর ভঙ্গুর হয়ে পড়া পুলিশ বাহিনী যখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছে, ঠিক তখনই এসবি প্রধান গোলাম রসুলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল ও বিতর্কিত করা গেলে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে—আর সেটিই এই অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য।
মাসুদ ও গোলাম রসুল আত্মীয় হতে পারেন, কিন্তু তারা ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন পেশায় কর্মরত। আত্মীয়তার সূত্র ধরে ভাষা ও শব্দের জালে জড়িয়ে প্রমাণহীন অভিযোগ ছড়ানো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় নয়।