1. dailyainerkantho@gmail.com : admin :
'গুপ্ত-সুপ্ত' বা তাকিয়া নীতিঃ আত্মরক্ষা নাকি মুনাফিকি!! (ইসলাম ও আধুনিক আইনের আলোকে ছোট্ট একটি বিশ্লেষণ) - dailyainerkantho
১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| গ্রীষ্মকাল| রবিবার| রাত ৪:৩০|
শিরোনামঃ
‎বাংলাদেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া কে নিয়ে (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধানের কটুক্তির প্রতিবাদে পঞ্চগড়ে বিক্ষোভ মিছিল পঞ্চগড়ের দুই মাদক কারবারীকে ৬ মাসের কারাদণ্ড তেঁতুলিয়ায় ডিসির মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের ভিডিও বক্তব্য ও ছবি তুলতে নিষেধ করায় অনুষ্ঠান বর্জন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাতক্ষীরার উন্নয়ন ও জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন কৃষক কার্ড বিতরণে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই: আইনমন্ত্রী পঞ্চগড়ে কৃষক কার্ড উদ্ধোধন তেতুলিয়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, BSSA এর ঈদ পুনর্মিলনী গেট টুগেদার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় থমকে আছে মোল্লাবাজার সেতুর কাজ: দ্রুত সমাপ্তির দাবিতে সিরাজদিখানে মানববন্ধন

‘গুপ্ত-সুপ্ত’ বা তাকিয়া নীতিঃ আত্মরক্ষা নাকি মুনাফিকি!! (ইসলাম ও আধুনিক আইনের আলোকে ছোট্ট একটি বিশ্লেষণ)

ডেস্ক রিপোর্ট
  • Update Time : রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬,
  • 132 Time View

নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে এক সন্ধ্যার পরে আমার আইনপেশার প্রথম গুরু- বিজ্ঞ আইনজীবী সাজিদুল ইসলাম উজ্জল ভাইয়ের চেম্বারে একটি মামলার বিষয়ের পর্যালোচনা শেষে অন্যান্য দিনের ন্যায় যথারীতি চা-পর্ব দিয়ে শুরু হল রাজনৈতিক গঠনমূলক আড্ডা।
সেখানে যুক্তি, নীতি, ব্যাখ্যা, পাল্টা যুক্তি, বৃত্তের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন ও তার সদুত্তর খোঁজার পায়তারা – সবই চলে।

যতক্ষণ বাসা থেকে বাজার নিয়ে ঘরে ফেরার ডাক না আসে, অথবা বাচ্চা ফোন করে না বলে ওঠে- বাবা কখন ফিরবে- ততক্ষণ চলে সক্রেটিসের দরবারের ন্যায় মৌলিক ও গঠনমূলক আলোচনা।

আইনপেশা একটি গুরুমুখী পেশা। গুরুমুখী হয়ে আইন বা রাজনীতি শিক্ষার এই মজলিশটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। সেখানে উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন ও নীতির ব্যবচ্ছেদে পারদর্শী প্রজ্ঞাবান একজন শিক্ষক পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।
তবে গোটা শিক্ষা জীবনের প্রতিটি স্তরেই আমি সময়ের সেরা প্রতিভাবান শিক্ষকদের স্নেহধন্য হয়েছি আলহামদুলিল্লাহ।

সেদিন হঠাৎ উজ্জল ভাই বর্তমান রাজনীতিতে আলোচিত গুপ্ত-সুপ্ত বা তাকিয়া নীতি নিয়ে বার বার কথা বলছিলেন। অর্থাৎ আত্মরক্ষা নীতির প্রয়োগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নিয়ে আলোকপাত করছিলেন।
সেখান থেকেই আমার মাথায় এই তাকিয়া নীতির ভূত চেপে বসলো। এখান থেকে আমাকে উদ্ধার হতেই হবে।
জিদ ধরলাম জানার জন্য।
এরপর বিষয় ভিত্তিক কুরআন কিতাবটি হাতে নিয়ে শুরু করলাম তাকিয়ার অনুসন্ধান।

তাকিয়া কি ইসলাম সমর্থন করে?
আধুনিক আইনে তাকিয়া কি অনুমোদিত?
তাকিয়া আসলে কী?

অল্প বিস্তর যা জানলাম, তাই সবিস্তারে নিচের বয়ানে তুলে ধরলাম-
ইসলামে তাকিয়া হলো- জীবন, জান-মাল বা মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কায় নিজের ঈমান বা বিশ্বাস সাময়িকভাবে গোপন রাখা বা প্রকাশ না করা।

তবে এটা কখনোই মিথ্যা বলা বা প্রতারণা করার লাইসেন্স নয়; বরং চরম জবরদস্তি ও নিপীড়নের মতো পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার একটি ব্যতিক্রমী বিধান।

এটির প্রধান ভিত্তি স্বয়ং আল-কুরআন।
সূরা নাহলের ১০৬ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করে- তাকে শাস্তি দেওয়া হবে; তবে সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যাকে জোর করা হয়েছে কুফুরি বলতে অথচ তার হৃদয় ঈমানে অবিচল।’
মূলতঃ এখান থেকেই তাকিয়া বা আত্মরক্ষা নীতির বৈধতার মূলনীতি এসেছে।

আরেকটি হলো সূরা আলে ইমরানের ২৮ নং আয়াত। সেখানেও আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
‘মুমিনরা যেন মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফিরদের বন্ধু না বানায়- তবে আত্মরক্ষার জন্য সেটা ব্যতিক্রম।’

উক্ত দুটি আয়াতের ব্যাখ্যা পড়তে গিয়ে দেখলাম তিরমিজি শরিফের একটি হাদিসে সাহাবিদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
একবার হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)- কে মুশরিকরা নির্যাতন করে কুফরি কথা বলাতে বাধ্য করেছিল। পরে রাসূল সঃ বলেন,
‘যদি তারা আবারও বাধ্য করে, তুমিও তাই করবে।’

অর্থাৎ হৃদয়ে ঈমান অটুট থাকলে জবরদস্তিমূলক কথার জন্য গুনাহ নেই।

তবে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল- তাকিয়া বৈধ হবে তখন, যখন প্রাণ বা গুরুতর ক্ষতির বাস্তব আশঙ্কা থাকে, জবরদস্তি থাকে, হৃদয়ে ঈমান অটুট থাকে, অন্যের ক্ষতি বা প্রতারণার উদ্দেশ্য না থাকে এবং তাতে যখন পার্থিব কোনো উদ্দেশ্য নিহিত না থাকে।

মোদ্দাকথা; স্বার্থ, রাজনীতি, ব্যবসা, ক্ষমতা বা সাধারণ সুবিধার জন্য তাকিয়া হারাম।
সুতরাং তাকিয়া হল চরম অবস্থায় ব্যতিক্রম নীতি, সাধারণ কোনো নীতি নয়।

মরণ বা ভয়াবহ জুলুমের মুখে ঈমান রক্ষা করতে বিশ্বাস গোপন রাখা প্রতারণা নয়, বরং আত্মরক্ষার অনুমতি। স্বাভাবিক অবস্থায় সত্য গোপন করা ইসলামসম্মত নয়।
স্মর্তব্য যে, যদি বাস্তবতার চূরান্ত অবস্থা পরিলক্ষিত না হয়, তাহলে তখন তাকিয়া নীতি অবলম্বন হল তাকিয়ার নামে মুনাফিকি করা।

এরকম একটি অবস্থায় হঠাৎ করেই আমাদের দন্ডবিধির সাধারণ ব্যতিক্রমের একাধিক ধারার বিষয় আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
অর্থাৎ দন্ডবিধির আত্মরক্ষার Self defence is no offence- নীতিটি তাকিয়া নীতিকে আকর্ষিত করলো।
আমিও নাছোরবান্দা। দন্ডবিধির জুরিপ্রুডেন্সিয়াল কিছু নীতি খুঁজে বের করলাম।

তখন মনে পরলো অনেক আগের একটি পড়া বইয়ের কথা। ড. বেলাল হোসেন জয় সাহেবের Law Lanagement Skills.
সে বইতে তিনি কুরআন থেকে আহরিত কিছু আয়াতের কিছু মৌলিক তুলনামূলক বিষয় নিয়ে আমাদের অপরাধ আইনের সাথে সেগুলোর সামঞ্জস্য বিধান করার চেষ্টা করেছেন।
সেখানে দেখলাম, সূরা বাকারার ১৯০ নং আয়াতে আত্মরক্ষার মৌলিক নীতি নিয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা তুলে ধরেছেন-
‘যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না।’
অর্থাৎ প্রথম আক্রমণ বৈধ নয়, আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ বৈধ এবং প্রতিরোধ সীমার মধ্যে হতে হবে।
অবশ্য এটা ইসলামের বৈধ রণকৌশলও বটে।

মূলতঃ এটাই কুরআনের Self-defence Doctrine।
তবে সূরা বাকারার ১৯৪ নং আয়াতে আমাদের অপরাধ আইনের Reciprocity Principle বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
‘যদি তারা তোমাদের উপর আক্রমণ করে, তবে তোমরাও তাদের উপর আক্রমণ করো ঠিক ততটুকুই যতটুকু তারা করেছে।’
– এটিই আমাদের আধুনিক আইনের proportionality নীতির সমান্তরাল দর্শন।

কয়েকদিন আগে একটি ল’ রিভিউতে পড়েছিলাম, তৎকালীন পাকিস্তানের বিতর্কিত চিফ জাস্টিস এম মনিরের Doctrine of necessity এর ভুল প্রয়োগ নিয়ে। তিনি ১৯৫৪ সালে গভর্নরের সংবিধান অমান্য করাকে বৈধতা দিতে গিয়ে ভিত্তি তিনি ধরেছিলেন সূরা বাকারা ১৭৩ নং আয়াতের, ‘যে ব্যক্তি বাধ্য হয়—বিদ্রোহী বা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে- তার জন্য কোনো গুনাহ নেই।’

তিনি Exception doctrine- কে ভুলভাবে এপ্লাই করে একটি বিতর্কের জন্ম দিয়ে আজো পর্যন্ত পাকিস্তানকে একটি চিরস্থায়ী সামরিক রাষ্ট্র বানিয়ে রাখতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন।
সেদিনের তার সেই জবরদস্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান পরোক্ষ যুক্তি ছিলো তাকিয়া বা আত্মরক্ষা, নিষিদ্ধ কাজের ব্যতিক্রম নীতি।

আসলে তাকিয়া হলো- compelled self-preservation, যা সূরা নাহলের ১০৬ নং আয়াতের, ‘যাকে জোর করা হয়েছে, অথচ তার অন্তর ঈমানে স্থির’ – এখান থেকেই আমাদের দণ্ডবিধিতে উৎসারিত Self-defence is no offence নীতি।
যেটা দন্ডবিধির- ৯৬ ধারায় (বাংলাদেশ/ভারত) বর্ণিত, ‘যা কিছু ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের সময় করা হয়, তা অপরাধ নয়।’
এটি সরাসরি ঘোষণা যে, Self-defence is no offence.

আবার দন্ডবিধির ধারা – ৯৭ তে দেহ ও সম্পত্তির আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত। ১০০ নং ধারায়
প্রাণনাশের আশঙ্কা হলে আত্মরক্ষায় আক্রমণকারীকে হত্যা করলেও অপরাধ নয় বলা আছে। একদম সূরা বাকারা ১৯০-১৯৪ এর সাক্ষাৎ প্রতিফলন।

এদিকে Doctrine of necessity নিয়ে দন্ডবিধির-১০৬ ধারায় আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে নিরপরাধের ক্ষতি হলেও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

যেমন- ছোট বেলায় শুনেছি, জীবন বাঁচানোর জন্য মরা গরু খাওয়া জায়েজ আছে। সেটারই চূরান্ত একটি ধরন হল এই তাকিয়া নীতি।
মূলতঃ বাধ্য হলে গুনাহ নেই – এটাই এই নীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

এটাকে আমি ছোট্ট আকারে Legal-Islamic সেন্স থেকে আমার মতো করে একত্রে পাশাপাশি বসানোর চেষ্টা করলাম কিঞ্চিৎ।

তবে আত্মরক্ষার এই বিশেষ রূপ হলো- সেটা হতে হবে faith- based. এটাকে ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ নাই। আইনের কাঠগড়া আর পরকালের কাঠগড়া- কোনোটাই ফেইস করা সহজ নয়, যদি এই নীতির প্রয়োগে গলদ থাকে।

তবে আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়েছি যে, Self defence is no offence- নীতি বরং কোনো পশ্চিমা ধারণা নয়; এটি কুরআনের একটি মৌলিক নীতি, যা আধুনিক দণ্ডবিধিতে আইনি রূপ পেয়েছে।

তাকিয়া নীতি অবলম্বন করা মুনাফিকি- এই অ্যাঙ্গেল থেকে একচেটিয়া ব্যাখ্যার সুযোগ নাই।
বরং আধুনিক আইন তথা আমাদের কমন ল’ সিস্টেমও তাকিয়াকে বৈধতা দিয়ে উচ্চাসনে রেখেছে এবং এই নীতিকে অবলম্বন করে বিশ্ব বরেন্য অনেক বড় বড় ডিফেন্স-ট্রায়াল লইয়ারের জন্ম হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 dailyainerkantho