
শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামায় সুঁই-সুতো হাতে প্রধান শিক্ষিকা
সাইফ উল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার:
এক হাতে সুঁই, অন্য হাতে সুতো। মনোযোগ দিয়ে সেলাই করছেন শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা। তাঁর কাছে এটি কেবল একটি জামা মেরামত নয়, বরং বিদ্যালয়ে আসা ছোট্ট শিশুটির প্রতি মমতা, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসার প্রকাশ। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এমন ছোট ছোট সমস্যায় পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার বেরীকান্দী বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাইলা বেগম।
শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, যেন মমতাময়ী মা। নিজের সন্তানদের যেভাবে আগলে রাখেন, বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রতিও তাঁর আচরণ ঠিক তেমনই। কারও জামা ছিঁড়ে গেলে সেলাই করে দেওয়া, লেখার খাতা না থাকলে কাগজ কিনে খাতা তৈরি করে দেওয়া—এমন কাজ দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন তিনি। প্রচারের জন্য নয়, বরং নিজের স্বভাবের অংশ হিসেবেই এসব করেন বলে জানিয়েছেন এই শিক্ষক।
সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা নিজ হাতে সেলাই করে দেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাঁর এই মানবিক উদ্যোগের কথা সামনে আসে। প্রশংসায় ভাসতে থাকেন নাইলা বেগম। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের এমন দৃষ্টান্ত শিক্ষকতার প্রকৃত সৌন্দর্যকে তুলে ধরে।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খাইরুন নাহার লিপি নিজের ফেসবুক আইডিতে নাইলা বেগমের এই কাজের বর্ণনা ও ছবি প্রকাশ করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়।
বিদ্যালয়ের আরেক সহকারী শিক্ষক মরিয়ম মালা লেখেন, তাঁর প্রধান শিক্ষক প্রায়ই এমন কাজ করেন। কোনো শিক্ষার্থীর লেখার খাতা না থাকলে নিজেই কাগজ কিনে সেলাই করে খাতা তৈরি করে দেন।
ফারুক জাহাঙ্গীর নামের একজন লেখেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বই-খাতা সেলাই করে দেওয়া, বৃত্তি পরীক্ষার ফি দেওয়া, জাতীয় দিবসে পোশাক ইস্ত্রি করে দেওয়া কিংবা অসুস্থ শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার মতো কাজ করেন। কোনো শিশু না খেয়ে বিদ্যালয়ে এলে নিজের টিফিন ভাগ করে দেওয়া বা টাকা দিয়ে খাবার কিনে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। তাঁর মতে, এসব কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষকেরা পাঠদানের বাইরেও শিশুদের প্রতি দায়িত্ব পালন করেন।
রাকিবুল আলমের মন্তব্যেও উঠে আসে ভালো কাজের প্রশংসার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির গুরুত্ব। তিনি লেখেন, একজন শিক্ষকের মহানুভবতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি মমত্ববোধের প্রশংসা করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না বা যথাযথভাবে পাঠদান করেন না, তাঁদের অনিয়মের গঠনমূলক সমালোচনাও জরুরি। প্রশংসা ও সমালোচনা—দুটিই সুস্থ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার অংশ।
অন্যদিকে শামীমা শোভা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশনের ধরন নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন। তাঁর আশঙ্কা, এমন একটি মানবিক ঘটনাকেও কেউ কেউ নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন।
‘দেখানোর জন্য করি না, এটা আমার স্বভাব’
নিজের কাজ নিয়ে নাইলা বেগম বলেন, ‘আমি এগুলো সব সময়ই করি। কাউকে দেখানোর জন্য কিংবা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে এসব করি না। এগুলো আমার স্বভাবের অংশ। আমার এক সহকর্মী ছবিটি তুলে ফেসবুকে দিয়েছেন। কখনো চাইনি এসব কাজ গণমাধ্যমে প্রকাশ হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকতা একটি নৈতিকতার পেশা। দোয়া করবেন, যেন চাকরিজীবনের বাকি সময়টুকুও শিক্ষার্থীদের মায়ের মমতায় এভাবেই পাশে থেকে শিক্ষা দিতে পারি।’
নাইলা বেগমের ব্যক্তিজীবনেও রয়েছে পরিবার ও সন্তানদের ঘিরে নানা ব্যস্ততা। তিনি তিন সন্তানের জননী। তাঁর স্বামী খয়েরদিরচর আলীম মাদ্রাসার সহকারী সুপার হিসেবে কর্মরত। বড় ছেলে অনার্সে পড়ছেন। ছোট ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। তাঁদের একমাত্র মেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) অধ্যয়নরত।
তবে পরিবার সামলানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতি এই মমত্ববোধই তাঁকে আলাদা করে চিনিয়েছে। ১৯৯৭ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি শিশুদের বই-খাতা সেলাই করে দেওয়া, ছেঁড়া জামা মেরামত করাসহ নানা প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন নাইলা বেগম। কর্মজীবনের শুরুতে বাদশাগঞ্জ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে চার বছর শিক্ষকতা করেন। এরপর ভাটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই বছর এবং নিজের শৈশবের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫ বছর শিক্ষকতা করেন। পরে বালিজুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বেরীকান্দী বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত।
ছোট্ট কাজ, বড় শিক্ষা
উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘একটি জামা সেলাই করে দেওয়া হয়তো খুব বড় কোনো কাজ নয়। কিন্তু একটি শিশুর কাছে এই ছোট্ট উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে ভালোবাসা ও আপনত্বের গভীর অনুভূতি।’
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের পাতায় লেখা পাঠ থেকেই নয়, শিক্ষকদের এমন আচরণ থেকেও সহমর্মিতা, মানবিকতা ও অন্যের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পায়।
একটি ছেঁড়া জামা সেলাই করে দেওয়া হয়তো খুব সাধারণ ঘটনা। কিন্তু যে শিশুটি নিজের অসহায়ত্বের মুহূর্তে শিক্ষকের হাতে যত্নের স্পর্শ পায়, তার কাছে সেই মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে বিশেষ এক স্মৃতি। কারণ, শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়; শিশুদের মনে ভালোবাসা, মানবিকতা ও সহমর্মিতার বীজ বুনে দেওয়াও।
নাইলা বেগমের হাতে ধরা সুঁই-সুতো তাই শুধু একটি জামা জোড়া লাগায় না, জোড়া লাগায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের অদৃশ্য বন্ধনও। সেই বন্ধনের নাম—মমতা।