
কয়েকদিন আগেও ভেনেজুয়েলার সামরিক মহড়ায় আকাশ-বাতাস কাঁপানো স্লোগান ছিল— “দেশের জন্য জীবন দেবো, তবুও আমেরিকার কাছে মাথানত করবো না।” সামরিক, আধা-সামরিক থেকে শুরু করে বেসামরিক সাধারণ মানুষ—সবাইকে দেখা গিয়েছিল যুদ্ধের এক রণসজ্জায়। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা কী ছিল? মাত্র কয়েকটি হেলিকপ্টার আর কয়েকজন বিশেষায়িত সৈন্য এসে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাদের সুরক্ষিত প্রাসাদ থেকে তুলে নিয়ে গেল। কোনো দৃশ্যমান প্রতিরোধ নেই! চীন ও রাশিয়ার সরবরাহকৃত অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও একটি পাল্টা গুলি পর্যন্ত ছোঁড়া হলো না।
এটা কি শুধুই সামরিক দুর্বলতা? না। এটা ছিল সামরিক বাহিনী ও ইন্টেলিজেন্সের ভেতরে লুকিয়ে থাকা চরম বিশ্বাসঘাতকতার ফল। ইতিহাস সাক্ষী—যে রাষ্ট্র ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে, তাকে বাইরে থেকে ধ্বংস করতে বড় শক্তির প্রয়োজন হয় না।
ঠিক যেমনটি আমরা দেখেছিলাম ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে। সব রকমের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও মার্কিন বাহিনী আকাশসীমা লঙ্ঘন করে পঙ্গু ও প্রায় শয্যাশায়ী ও-সা-মা বিন লা-দে-ন-কে হত্যা করে নিয়ে গেল। সেই সময়ও পাকিস্তানের রাডার কোনো সিগন্যাল দিতে পারেনি। এর কারণ ছিল উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা ব্যর্থতা অথবা ভেতরের কোনো স্তরের গোপন সমঝোতা।
( বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের ‘সিস্টেম সারেন্ডার’ বা অভ্যন্তরীণ পতনের আরও কিছু ভয়াবহ উদাহরণ রয়েছে৷ )
১. পানামার ম্যানুয়েল নরিয়েগা (১৯৮৯): মার্কিন ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ শুরু হওয়ার পর নরিয়েগার নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। নিজের সেনাবাহিনীর একাংশের নিষ্ক্রিয়তায় তিনি শেষ পর্যন্ত বন্দি হন।
২. ইরাকের পতন ও বাগদাদ দখল (২০০৩): সাদ্দাম হোসেনের প্রশিক্ষিত ‘রিপাবলিকান গার্ড’ থাকা সত্ত্বেও বড় বড় জেনারেলরা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়েছিলেন অথবা গোপনে শত্রুর সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। ফলে কোনো রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ ছাড়াই বাগদাদের পতন ঘটে।
৩. লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি (২০১১): ন্যাটোর আক্রমণের সময় গাদ্দাফির গোয়েন্দা সংস্থা ও বিশ্বস্ত সেনানায়কদের অনেকেই বিদ্রোহ করে বা অবস্থান ফাঁস করে দেয়। ফলে চূড়ান্ত বিপদের সময় তার আধুনিক অস্ত্রগুলো আর কোনো কাজে আসেনি।
৪. বাংলাদেশের পিলখানা ট্র্যাজেডি (২০০৯): আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে পিলখানা এক রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত ইতিহাস। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিডিআর (বর্তমান বিজিবি)-এর ভেতরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই বিদ্রোহ ঘটানো হয়েছিল। তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা এবং ৫৭ জন চৌকস ও দেশপ্রেমিক সেনাকর্মকর্তাকে হত্যার মাধ্যমে জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। এটি ছিল মূলত একটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সফল বাস্তবায়ন, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ঘাতকদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল।
★ আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা কী?
আমাদের বারবার শেখানো হয়, পাশের দেশ আমাদের ‘বন্ধু’। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস একবাক্যে বলে: পাশের রাষ্ট্র কখনো চিরস্থায়ী বন্ধু নয়, বরং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশ আজ হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে আধুনিক অস্ত্র কিনছে, আকাশ প্রতিরক্ষা গড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—কাকে কেন্দ্র করে এই প্রস্তুতি?
যদি সেই শক্তির ভেতরেই শত্রুর দোসররা ঘাপটি মেরে থাকে, তবে এই অস্ত্র কেবল প্রদর্শনীতেই থেকে যাবে। ভেনেজুয়েলার মাদুরোর মতো আমাদের সিস্টেমও তখন “সারেন্ডার” করবে—অস্ত্র থাকবে, কিন্তু তা দেশের প্রয়োজনে গর্জে উঠবে না। পিলখানার ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে দেশপ্রেমিকদের একে একে সরিয়ে দেওয়া হয়। আগামীতেও হয়তো দেশপ্রেমিক হাদি কিংবা সত্যিকারের বীরদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হবে।
★ ইতিহাসের শিক্ষা পরিষ্কার:
* অস্ত্র দরকার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার বিশ্বস্ত মানুষ।
* নিরাপত্তা মানে শুধু প্রযুক্তি নয়, দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব।
* ইন্টেলিজেন্স, প্রশাসন ও মিলিটারিতে ঘাপটি মারা দালালদের আগে চিহ্নিত করে সরাতে হবে।
* বিপদ এলে কেউ কাউকে রক্ষা করতে আসে না—রাশিয়া-চীনও তাদের মিত্রকে বাঁচাতে পারেনি।
রাষ্ট্রের চিরস্থায়ী কোনো বন্ধু নেই; আছে শুধু স্বার্থ আর শক্তি। নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। দেশপ্রেমিকদের দিয়ে ইন্টেলিজেন্স গড়তে হবে, তাদের হাতেই দিতে হবে সামরিক নেতৃত্ব। এই দেশটা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়—এই দেশটা আমাদের প্রত্যেকটি প্রকৃত দেশপ্রেমিক নাগরিকের। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন থাকাই হোক আমাদের শপথ।
মাওলানা আতিকুর রহমান কামালী
অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনীতিবিদ।