- ‘নারীদের ১০০ আসনে পিআর চায় জামায়াত’
- রাষ্ট্রের মূলনীতির ব্যাপারে ঐকমত্য হয়নি
জুলাই সনদের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। আজ সোমবারের মধ্যেই এটি রাজনৈতিকদলগুলোর কাছে পৌঁছানো হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। দলগুলো দ্রুত মতামত দিলে সেটা সন্নিবেশিত করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে (৩১ জুলাই) আমি আশা করছি অনেকগুলো কাজ সম্পাদন করে আমরা প্রক্রিয়াটা (জুলাই সনদ) সম্পন্ন করতে পারবো বা চূড়ান্তে উপনীত হতে পারবো। আপনারা (রাজনৈতিক দলগুলো) অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করছেন, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি। সেই চেষ্টায় অবশ্যই সফলতা আসবে। এই বিশ্বাস ও আস্থা আমাদের রাখা দরকার।
গতকাল রোববার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফার ১৯তম দিনের বৈঠকের শুরুতে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আলী রীয়াজ। গতকালের বৈঠকে আলোচ্য বিষয় ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি; নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ ও পুলিশ কমিশন গঠন।
সনদের খসড়া নিয়ে সংলাপে আলোচনা করা হবে না জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘যদি বড় রকমের মৌলিক আপত্তি ওঠে, তাহলে আলোচনায় আনব, না হলে আনব না। আপনাদের পক্ষ থেকে মতামত দেয়া হলে সেটা সন্নিবেশিত করে প্রাথমিক সনদে ভূমিকা-পটভূমি থাকবে এবং কমিটমেন্টের জায়গা থাকবে।’
আলী রীয়াজ জানান, জাতীয় সনদ সইয়ের জন্য চলমান আলোচনায় একটি দিন বরাদ্দ রাখা হবে। তিনি বলেন, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ঐকমত্য কমিশনের চলমান আলোচনা শেষ করা হবে। ১০টি বিষয়ে আমরা ঐকমত্য হয়েছি। সাতটি বিষয়ে ঐকমত্য অসমাপ্ত আছে। আর তিনটি বিষয়ে আলোচনা এখনো হয়নি।
রাষ্ট্রের মূলনীতির ব্যাপারে ঐকমত্য হয়নি : গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গড়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা। সন্ধ্যায় বৈঠকের বিরতিকালে ব্রিফিংয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানান, রাষ্ট্রের মূলনীতির বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ঐকমত্য পৌঁছেনি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের মূলনীতি বিষয়ে যে আলোচনা এটি আজকে চতুর্থ দিনের মতো ছিল। এই চার দিনের আলোচনায় আমরা দেখেছি, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে যে সমস্ত প্রস্তাব (সাম্য ও মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি) কমিশনের পক্ষ থেকে সংশোধিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল। এগুলো কিভাবে সংবিধানে উল্লেখিত হবে এ বিষয় নিয়ে ঐকমত্যে আসা যাচ্ছে না।
আলী রীয়াজ বলেন, এক পক্ষ থেকে বিদ্যমান যে চার মূলনীতি আছে তার সাথে এটিকে সংযুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে, বিদ্যমান চার মূলনীতির বিষয়ে কোনো বক্তব্য না রেখেই। কেউ কেউ বলছেন, ভবিষ্যতে অন্য বিষয়গুলো উল্লেখিত হতে পারে আবার নাও হতে পারে। ফলে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, এ বিষয়ে ঐকমত্যে আসা যাচ্ছে না।
কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিশন এখন এটাকে পুনর্বিবেচনার জন্য নিয়েছে। কমিশনকে এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আমরা আশা করছি, ৩১ জুলাইয়ের আগেই আমরা এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত দেব।
প্রধানমন্ত্রী পদে ১০ বছর এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে দলগুলো একমত : এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে পারবেন বলে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। একইসাথে তারা স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনেও একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন, কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ। গতকাল বৈঠকে আলোচনাকালে তিনি বলেন, আমরা একটা বিষয়ে একমত হয়েছিলাম; কিন্তু সেটা বলা হয়নি। সেটা হলো প্রধানমন্ত্রী ১০ বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন। সনদে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর উল্লেখ করবো। এ বিষয়ে আমরা কি একমত হয়েছি? এ সময় আলী রীয়াজ বলেন, এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ সাহেব একটি শর্ত দিয়েছিলেন, সেটা কি এখনো আছে?
পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমেদ বলেন, আমরা একবার বলেছি তো বলেছি ১০ বছরর বেশি কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন না। আমি বলেছিলাম সংবিধান ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের কমিটি থাকলে বিষয়টি মানব না। আমরা এ হাউজের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে যুক্ত করবো। এর বাইরে বিষয়ে আলোচনা হলে আমাদের শর্ত বহাল থাকবে। আশাকরি সেটা বিবেচনা করবেন। এখন ১০ বছরের বিষয়ে আপনারা ঘোষণা দিতে পারেন। বরং এটা আমাদের প্রস্তাব।
আসন্ন নির্বাচনে সরাসরি নারী আসন ৫ শতাংশ চায় বিএনপি : নারী আসন বিষয়ে বিএনপির প্রস্তাব তুলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিদ্যমান ৫০টি নারী আসন ঠিক রাখার পক্ষে আমরা। যেহেতু আসন্ন নির্বাচনে সংবিধান সংশোধিত হচ্ছে না পার্লামেন্ট ছাড়া। আসন্ন নির্বাচনে বিধান মৌখিকভাবে ৩০০ আসনের ভিত্তিতে ৫ শতাংশ আসনে অর্থাৎ ১৫টি আসনে রাজনীতিক দলগুলো নারীদের সরাসরি নির্বাচনের মনোনয়ন দেবে এবং সংবিধান যখন সংশোধন হবে, সংশোধিত সংবিধানের ভিত্তিতে পরবর্তীতে যখন নির্বাচন হবে তখনকার জন্য প্রস্তাব করেছি, ৩০০ আসনের ভিত্তিতে ১০ শতাংশ আসনে অর্থাৎ ৩০টি আসনে নারীদেরকে সরাসরি নির্বাচনের মনোনয়ন দেয়ার কথা। প্রত্যেক দল যেন সেই বিধান রাখে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিদ্যমান সংরক্ষিত ৫০টি থাকলে সরাসরি নারী আসন ৩০টা সহ ৮০টি উন্নত হবে। এইভাবে যদি সমাজের অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়, নারী সমাজের অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় এবং জাতীয় ভিত্তিতে যদি জনমত আসে তখনকার বিবেচনায় তার পরবর্তী পার্লামেন্ট হয়তো এই ডাইরেক্ট নির্বাচন বিধানটা আরো সম্প্রসারিত করতে পারে। এই প্রস্তাব রেখেছি আমরা।
সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ^াস পুনঃস্থাপনে একমত বিএনপি, জামায়াতসহ অধিকাংশ দল : সংবিধানের মূলনীতিতে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ^াস পুনঃস্থাপনসহ কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক, সুবিচার, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্র্রীতি যুক্ত করার বিষয়ে একমত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সব দল। এ ক্ষেত্রে সিপিবিসহ বামপন্থী কয়েকটি দল এর বিপক্ষে। তারা ’৭২-এর সংবিধান বহাল রেখে প্রস্তাবিত বিষয়গুলো যুক্ত করার পক্ষে। তবে, এনসিপি বলছে, মুজিববাদী ’৭২-এর সংবিধান বাতিল করতে হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ক্ষেত্রে কমিশনের যে প্রস্তাবে আমরা একমত হয়েছি। রাষ্ট্র পরিচালনা মূলনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত বিষয়গুলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক, ন্যায়বিচার তার সাথে গণতন্ত্র ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি এই বিষয়গুলো যুক্ত করার কথা বলেছি। আমরা পঞ্চম সংশোধনীতে গৃহীত সমস্ত মূলনীতি সেটার সাথে একমত। সেখানে মহান আল্লাহর ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস আছে। সেখানে গণতন্ত্র আছে, জাতীয়তাবাদ আছে। মহান আল্লাহর ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস এই কথাগুলো পঞ্চম সংশোধনের পরবর্তীতে গৃহীত হয়েছে।
কমিশনের সাথে বৈঠকের বিরতিকালে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিস্থাপন এটা করতে হবে। আর আমাদের সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি উল্লেখিত হবে। এখানে কয়েকটি দল আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা এবং বিশ্বাসের বিরোধিতা করেছে। তবে আমরাসহ অধিকাংশ দলই আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা এবং বিশ্বাস মূল নীতিমালায় সংযোজন করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছে।
নারীদের ১০০ আসনে পিআর চায় জামায়াত : রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সংসদে নারী প্রতিনিধিদের ব্যাপারে কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে, এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য থাকবে কমপক্ষে। আমরা ৩০০ আসন পুরুষ ও ১০০ আসন নারীসহ ৪০০ আসনের পার্লামেন্টের ব্যাপারে অধিকাংশ দলই ঐকমত্য পোষণ করেছি। তবে নারী আসনের নির্বাচন প্রক্রিয়া কি হবে? এটা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। জামায়াতের বক্তব্য এ ব্যাপারে খুবই পরিষ্কার, আমরা ১০০ আসনের নারী প্রতিনিধি থাকতে পারে। তবে বলেছি, এইটা ৩০০ আসনের ভোটের আনুপাতিক হারে নারী আসন নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ পিআর পদ্ধতিতে ১০০ আসনে নারী সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছি।
স্বাধীন পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠনের বিষয়েও জামায়াত একমত জানিয়ে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, পুলিশ কমিশনের গঠন প্রক্রিয়ায় সবাই একমত।
‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন চার-পাঁচ দিনের মধ্যে একটা নির্বাচনের তারিখ দিবেন’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কাছে যতটুকু খবর আছে, প্রধান উপদেষ্টা এটা (নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন) বলেননি।







