
গণমাধ্যমের চটকদারিতা ও আলেমদের মিডিয়া ট্রায়াল: গাজিপুরের ঘটনাটি আসলে কীসের ইঙ্গিত?
মুফতি আইনুল হক কাসেমী
গতকাল থেকে সংবাদমাধ্যমে বেশ শোরগোল—গাজিপুরের একটি হোটেল থেকে নাকি দুজন আলেমসহ সাতজনকে আটক করা হয়েছে। স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল ছবিতে সাদা রুমালে মুখ ঢাকা দুজন আলেমকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ঢালাওভাবে কাউকে অভিযুক্ত করলেই কি সে অপরাধী হয়ে যায়? ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখুন তো—কেবল পোশাক বা আলেম পরিচয়ের কারণে কাউকে কি অপরাধী বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়?
বাস্তবতা কিন্তু একেবারেই ভিন্ন হতে পারে। চিকিৎসার প্রয়োজনে, কোথাও সফরকালে, কিংবা জরুরি প্রয়োজনে দূর থেকে এসে নিকট আত্মীয়ের বাসায় ওঠার সুযোগ না থাকায় নিজের বৈধ স্ত্রীকে নিয়ে হোটেলে ওঠা কি কোনো আইনি বা নৈতিক অপরাধ? অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন কোনো হোটেলে অভিযান চালায়, তখন প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি কোনো বৈধ দম্পতি বা নিরপরাধ আলেম বিপদে পড়লেও তাদের একই পাল্লায় মেপে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
আজ থেকে প্রায় ১০–১২ বছর আগের একটি সত্য ঘটনা মনে পড়ে। আমার এক সহপাঠী, যিনি নিজে একজন আলেম, সিলেটের বাইরে এক জায়গায় খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। উনার স্ত্রী সিলেট শহরের একটি মহিলা মাদরাসায় লেখাপড়া করতেন। শহরে কোনো নিকটাত্মীয়ের বাসা না থাকায় মাঝেমধ্যে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি একটি হোটেলে অবস্থান করতেন। একদিন সেই হোটেলে পুলিশি অভিযান চললে অন্যান্যদের সাথে তাদেরকেও অনৈতিক কাজের তকমা দিয়ে আটক করার চেষ্টা করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে সাথে কাবিননামা না থাকায় চরম হেনস্তার শিকার হতে হয় তাদের। শেষ পর্যন্ত উভয় পরিবারের অভিভাবক ফোনে বিষয়টি স্পষ্ট করার পর তারা মুক্তি পান। পরবর্তীতে সেই বন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন—একজন সাধারণ মানুষ স্ত্রী নিয়ে হোটেলে উঠলে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলে না, কিন্তু কোনো আলেম প্রয়োজনে স্ত্রীকে নিয়ে গেলেও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি রাতারাতি বদলে যায়।
গাজিপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাটিতেও খেয়াল করুন—আটক সাতজনের মধ্যে বাকি পাঁচজনকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের বিশেষ কোনো মাথাব্যথা নেই। গণমাধ্যমের পুরো নজর কেবল ওই ‘দুই আলেম’-এর ওপর! সংবাদমাধ্যমের এই চটকদার মানসিকতা (Sensationalism) এবং ঢালাও প্রচারণার কারণে সমাজে পরিকল্পিতভাবে এক ধরনের ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি বিদ্বেষ উসকে দেওয়া হচ্ছে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সাম্প্রতিক সময়ে মাদরাসা ও আলেমসমাজকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টারই একটি অংশ। দেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নূরানী ও কওমি ধারা বর্তমানে সর্বসাধারণের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, অনেক সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমছে। একটি মহল বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে না নিয়ে দেশের আনাচেকানাচে গড়ে ওঠা নূরানী ও কওমি মাদরাসাকে দোষারোপ করছে। আর এর পর থেকেই সমাজের চোখে মাদরাসা-শিক্ষার ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য সেই মহলটিকে নানা কৌশলে সরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে।
কিছু ব্যক্তিক্রমী বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন পুরো কওমি ও মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়, তখন এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ জাগা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
আইনি প্রক্রিয়া বা সত্যতা উন্মোচনের আগেই কাউকে গণমাধ্যমের কাঠগড়ায় অপরাধী বানিয়ে দেওয়া এবং তার ওপর ভিত্তি করে একটি পুরো গোষ্ঠীকে হেয় করা কোনো সুস্থ ও সভ্য বিচারবুদ্ধির পরিচয় হতে পারে না। আবেগের বশে মিডিয়ার এসব একপেশে প্রচারণা গিলে না খেয়ে, ঘটনার পেছনের সামাজিক বাস্তবতা ও উদ্দেশ্য গভীরভাবে উপলব্ধি করাই এখন সময়ের দাবি ও সচেতন নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব।