
বিশেষ করে নারী নেতৃত্বে শিবির-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয় এই নির্বাচনে এক নতুন ইতিহাস গড়েছে। দীর্ঘ বছর পর অনুষ্ঠিত এই দুই ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট ও সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের এই বিজয় বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির চিত্রে আলোচিত পরিবর্তন এনেছে।
এবারের নির্বাচনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে ৯টিতে এবং ১৩টি সদস্যপদের মধ্যে ১১টিতে জয় পেয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর প্রার্থীরা। ভিপি (সহ-সভাপতি) পদে শিবির নেতা মো. আবু সাদিক কায়েম ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৫ হাজার ৭০৮ ভোট। পরবর্তী অবস্থানে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম হোসেন (৩ হাজার ৮৮৩), স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের উমামা ফাতেমা (৩ হাজার ৩৮৯), বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদের আব্দুল কাদের (১ হাজার ১০৩) এবং প্রতিরোধ পর্ষদের তাসনিম আফরোজ ইমি (৬৮)।
জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে বিজয়ী হয়েছেন শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ। তিনি পেয়েছেন ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের শেখ তানভীর বারি হামিম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থী ছাত্র ইউনিয়নের মেঘমল্লার বসু পেয়েছেন ৪ হাজার ৯৪৯ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী আরাফাত চৌধুরী ৪ হাজার ৪৪ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদের আবু বাকের মজুমদার পেয়েছেন ২ হাজার ১৩১ ভোট।
এজিএস (সহ সাধারণ সম্পাদক) পদে শিবিরের মুহা. মহিউদ্দিন খান পেয়েছেন ১১ হাজার ৭৭২ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের তানভীর আল হাদী মায়েদ পেয়েছেন ৫ হাজার ৬৪, স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমীদ আল মুদাসসীর ৩ হাজার ৮, প্রতিরোধ পর্ষদের জাবির আহমেদ জুবেল ১ হাজার ৫১১, মহিউদ্দিন রনি ১ হাজার ১৩৭, আশরেফা খাতুন ৯০০, আশিকুর রহমান জিম ৭৯৬ এবং হাসিব আল ইসলাম পেয়েছেন ৫২০ ভোট।
সিনেট ভবনে সকাল থেকে ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা। শিবিরের প্যানেল থেকে সম্পাদক পদে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতেমা তাসনিম জুমা পেয়েছেন ১০ হাজার ৬৩১ ভোট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল হায়দার ৭ হাজার ৮৩৩, আন্তর্জাতিক সম্পাদক খান জসিম ৯ হাজার ৭০৬, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ ৯ হাজার ৬১, ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসাইন ৭ হাজার ২৫৫, কমনরুম, রিডিং রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমা ৯ হাজার ৯২০, মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক সাখাওয়াত জাকারিয়া ১১ হাজার ৭৪৭, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক এম এম আল মিনহাজ ৭ হাজার ৩৮ এবং ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম পেয়েছেন ৯ হাজার ৩৪৪ ভোট।
শিবির প্যানেলের বাইরে সমাজসেবা সম্পাদক হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবাইর বিন নেছারী (৭ হাজার ৬০৮), সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হয়েছেন মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ (৭ হাজার ৭৮২) এবং গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছেন সানজিদা আহমেদ তন্বি (১১ হাজার ৭০৮)।
শিবিরের প্যানেল থেকে কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সর্ব মিত্র চাকমা (৮ হাজার ৯৮৮), সাবিকুন নাহার তামান্না (১০ হাজার ৮৪), ইমরান হোসাইন (৬ হাজার ২৫৬), আনাস বিন মনির (৫ হাজার ১৫), মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ (৫ হাজার ১৫), রাইসুল ইসলাম (৪ হাজার ৫৩৫), মো. শাহিনুর রহমান (৪ হাজার ৩৯০), আফসানা আক্তার (৫ হাজার ৭৪৭), রায়হান উদ্দিন (৫ হাজার ৮২), বেলাল হোসেন অপু (৪ হাজার ৮৬৫) এবং তাজিনুর রহমান (৫ হাজার ৬৯০)। শিবিরের প্যানেলের বাইরে উম্মা উসওয়াতুন রাফিয়া (৪ হাজার ২০৯) ও হেমা চাকমা (৪ হাজার ৯০৮) নির্বাচিত হয়েছেন।
অন্যদিকে ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। টানা দুই দিন ভোট গণনার পর শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় সিনেট ভবনে ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনিরুজ্জামান। এই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট প্যানেল আকারে জয়ী হয়ে কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫টি পদের মধ্যে ২০টি দখলে নেয়।
জাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদের জিএস পদে নির্বাচিত হন মো. মাজহারুল ইসলাম। এজিএস (পুরুষ) পদে ফেরদৌস আল হাসান, এজিএস (নারী) পদে আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক আবু উবায়দা, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সম্পাদক মো. সাফায়েত মীর, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বাপ্পি, নাট্য সম্পাদক রুহুল ইসলাম, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রায়হান উদ্দিন, সহ-ক্রীড়া (নারী) সম্পাদক লুবনা, সহ-সমাজসেবা ও মানবসেবা (নারী) সম্পাদক নিগার সুলতানা, সহ-ক্রীড়া (পুরুষ) সম্পাদক মহাদী হাসান, তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাকার সম্পাদক রাশেদুল ইমন লিখন, সহ-সমাজসেবা ও মানবসেবা সম্পাদক তৌহিদ ইসলাম, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক হুসনী মোবারক, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক তানভীর রহমান এবং কার্যনির্বাহী সদস্য পদে ফাবলিহা জাহান, নাবিলা বিনতে হারুন, নুসরাত জাহান, হাফেজ তরিকুল ইসলাম ও আবু তালহা নির্বাচিত হয়েছেন।
শিবির প্যানেলের বাইরে জয়ী প্রার্থীরা হলেন সহসভাপতি (ভিপি) পদে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী প্যানেলের আব্দুর রশিদ জিতু, যিনি ৩ হাজার ৩৩৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের প্রার্থী মো. আরিফুল্লাহ পেয়েছেন ২ হাজার ৩৯২ ভোট এবং ছাত্রদলের প্রার্থী শেখ সাদী হাসান পেয়েছেন ৬৪৮ ভোট। শিবিরের বাইরে তিনটি সম্পাদক পদে বিজয়ী হয়েছেন মহিবুল্লাহ শেখ (সাংস্কৃতিক), মো. মাহমুদুল হাসান কিরণ (ক্রীড়া) ও আহসান লাবিব (সমাজসেবা)। কার্যনির্বাহী সদস্য পদে ইংরেজি বিভাগের মোহাম্মদ আলী চিশতী বিজয়ী হন।
শিবিরের এই অভাবনীয় জয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংগঠনিক প্রস্তুতি, দমন-পীড়নের ইতিহাস, সদ্য বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং শিক্ষার্থীদের চেতনায় সংগঠনের প্রতি গড়ে ওঠা সহানুভূতি। জাবির ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘ফাস্ট ইয়ারে বঙ্গবন্ধু হলে গণরুমে উঠি, সেখানেই শুনি শিবির করলে হল থেকে বের করে দেওয়া হবে। শিবির সন্দেহে অনেকে নিপীড়নের শিকার হয়েছে। সেখান থেকেই শিবির নিয়ে সহানুভূতি তৈরি হয়েছে।’ তিনি মনে করেন, এই সহানুভূতি এখন ভোটে রূপান্তরিত হয়েছে।
জানা যায়, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনীতির পালাবদলে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসে জাবি শিবির। ২৯ অক্টোবর কমিটি ঘোষণার পর এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, ব্লাড গ্রুপিং, নবীনবরণ, কোরআন বিতরণ, সাইকেল পাম্প বিতরণসহ কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড তাদের জনপ্রিয় করে তোলে।
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজ আলম বলেন, ‘ধর্মীয় বিশ্বাস ও সুষ্ঠু রাজনীতি চর্চা তাদের বিজয়ের অন্যতম কারণ।’ এক নারী শিক্ষার্থী জানান, ‘তাদের রাজনীতিতে কোনও দ্বন্দ্ব নেই, নারীদের নিরাপদ মনে হয়, প্যানেলের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করায় তারা জনপ্রিয়।’
এ বিষয়ে শাখা শিবিরের অফিস সম্পাদক ও জাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদে জিএস পদে জয়ী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাদের পছন্দ করে, আস্থা রেখে ভোট দিয়েছে। আমরা তাদের আস্থার প্রতি সম্মান রেখে যথাসাধ্য কাজ করে যাবো। শুধু শিবির হিসেবে না শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হয়ে তাদের হয়ে কাজ করা এখন আমাদের কর্তব্য। আমরা সবাই তা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।’