1. dailyainerkantho@gmail.com : admin :
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে স্বপ্নজয়ী উদ্যোক্তা - dailyainerkantho
১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| বর্ষাকাল| সোমবার| বিকাল ৩:৩০|

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে স্বপ্নজয়ী উদ্যোক্তা

আরিফ হোসেন
  • Update Time : শনিবার, জুন ৬, ২০২৬,
  • 64 Time View

 

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে স্বপ্নজয়ী উদ্যোক্তা

মোঃ আরিফ হোসেন, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিঃ

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে একটি ভালো চাকরি। কেউ ব্যস্ত থাকেন বিসিএস প্রস্তুতিতে, কেউবা কর্পোরেট ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে। তবে এই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের মো: ফাহাদ বিন সাঈদ। অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় মাত্র ১০টি গরু নিয়ে শুরু করেছিলেন একটি ছোট খামার। এক দশক পরে সেই খামারই পরিণত হয়েছে প্রায় ৭০টি গরুর আধুনিক খামারে। তার এই যাত্রা শুধু একটি ব্যবসার গল্প নয়; বরং সাহস, পরিশ্রম এবং উদ্যোক্তা মানসিকতার এক অনন্য উদাহরণ।

২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নিজের কিছু করার ইচ্ছা তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। ছোটবেলা থেকেই কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের প্রতি আগ্রহ ছিল। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই গরুর খামার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বুঝতে পারি, শুধু চাকরির পেছনে ছুটলেই সবার সফলতা আসে না। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন তখন আরও দৃঢ় হয়। এ ক্ষেত্রে আমার বড় ভাই সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তার উৎসাহ ও সহযোগিতাতেই খামারের যাত্রা শুরু করি।

খামার শুরু করার আগে তিনি গরু পালন, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই এবং বাজারজাতকরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। অভিজ্ঞ খামারিদের সঙ্গে কথা বলে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করেন।
শুরুতে মাত্র ১০টি গরু নিয়ে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হয়। সেই সময় গরুর খাদ্য দেওয়া, পরিচর্যা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে প্রায় সব কাজই নিজে তদারকি করতেন। তিনি জানান, শুরুতে অনেক ভুলও হয়েছে। তবে প্রতিটি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই সামনে এগিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খামারের পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে খামারে প্রায় ৭০টি গরু রয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে গরু মোটাতাজাকরণ ও উন্নত পরিচর্যার মাধ্যমে বাজারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। তাদের লক্ষ্য শুধু গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং সুস্থ, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন গরু উৎপাদন করা। খামারের শুরুটা ছিল বেশ বড় পরিসরে। গরু ক্রয়, শেড নির্মাণ, খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে শুরুতেই প্রায় অর্ধকোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছিল।খামারের পরিসর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগও বেড়েছে। বর্তমানে আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থা এবং গরুর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২ কোটিতে পৌঁছেছে।

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জন্য খামার পরিচালনা সহজ ছিল না। বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব, গরুর রোগব্যাধি সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান, বাজারের ওঠানামা এবং দক্ষ কর্মচারীর সংকট সবকিছুই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।এর পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এত পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত গরুর ব্যবসা করবে? তবে এসব সমালোচনাকে উপেক্ষা করে তিনি নিজের লক্ষ্যে অটল ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, কোনো কাজই ছোট নয়। আজ খামারের সফলতা সেই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে।
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি । বর্তমানে খামারে নিয়মিত তিনজন কর্মচারী কাজ করেন। তারা গরুর পরিচর্যা, খাদ্য সরবরাহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করেন। এ ছাড়া কোরবানির ঈদের আগে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে খামারটি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বেশ কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। গরুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভ্যাকসিন ও কৃমিনাশক প্রয়োগ করা হয়। খামার সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয় এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
খাদ্য ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে বিশেষ নজর। ঘাস, খড়, ভুসি, ভুট্টাসহ সুষম ও প্রাকৃতিক খাদ্যের মাধ্যমে গরুগুলোকে লালন-পালন করা হয়। পাশাপাশি নিয়মিত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়।
লাভের পাশাপাশি অর্জন মানুষের আস্থা
খামারের আয়-ব্যয়ের হিসাব সাধারণত ষাণ্মাসিক ভিত্তিতে করা হয়। সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে প্রতি গরুতে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ লাভ পাওয়া যায়। তবে বাজার পরিস্থিতির কারণে এই হার কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তবে আর্থিক লাভের চেয়েও বড় অর্জন হিসেবে তিনি দেখেন মানুষের আস্থা ও ভালোবাসাকে। তিনি বলেন, সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করার কারণে ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি। পাশাপাশি কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছি, যা আমার কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য।

ভবিষ্যতে তিনি খামারকে আরও আধুনিক ও বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যেতে চান। উন্নত জাতের গরু পালন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং একটি আদর্শ খামার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে তার। শিক্ষিত তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “শুধু চাকরির পেছনে ছুটে না গিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা করা উচিত। কৃষি ও খামার খাতের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এই খাত শুধু নিজের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করে না, অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম থেকে খামারে গড়ে ওঠা এই উদ্যোক্তার গল্প প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি, পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম থাকলে শিক্ষাজীবন থেকেই সফলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব। চাকরির প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতও হতে পারে শিক্ষিত তরুণদের জন্য সম্ভাবনাময় এক কর্মক্ষেত্র।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2026 dailyainerkantho কারিগরি সহযোগিতায়ঃ BDITWork.com