
ইসলাম ও রাজনীতি সম্পর্কে স্থূল বুদ্ধি সম্পন্ন কিছু লোক আকাবিরদের সংগঠন, ঐতিহ্যবাহী সংগঠন, হক্কানী আলেমদের সংগঠন ইত্যাদি বলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে থাকেন। অথচ তারা ইতিহাসের গত এক শত বছর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন না। ধীরগতিতে হলেও কীভাবে জমিয়ত নিজের জায়গায় দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে, অন্যরা যখন বারবার দিক পরিবর্তন করেছেন, উত্তান-পতন হয়েছেন—সেই বাস্তবতা অনেকে দেখেন না।
যারা বিষয়গুলো গভীরভাবে জানতে আগ্রহী, তারা আমার লেখা ‘দ্রাবিড় বাংলার রাজনীতি’ অথবা ‘সহবতে উলামা’ গ্রন্থদ্বয় পাঠ করতে পারেন।
* জমিয়তের স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য :
জমিয়তের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অন্যান্য অনেক ইসলামী বা রাজনৈতিক সংগঠনের মাঝে দেখা যায় না। এ বৈশিষ্ট্যগুলোই একে আলাদা পরিচয় দিয়েছে এবং দীর্ঘ পথচলায় স্থিতিশীল থাকতে সহায়তা করেছে। যেমন, ১. প্রাচীন দ্বীনি ও রাজনৈতিক সংগঠন।
২. প্রতিটি স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাদের ন্যায় এবং ইনসাফ সম্মত সিদ্ধান্ত।
৩. দ্বীনি ইলমের ক্ষেত্রে তাদের অবদান।
৪. ঈমান ও আকিদার ব্যাপারে আপোষহীনতা।
৫. পদ-পদবীর লোভে দলীয় নীতি পরিবর্তন না করা।
* একটি ভাবনার প্রশ্ন:
একটি প্রশ্ন আমাকে বারবার ভাবায়—
অন্যান্য ইসলামী দল যখন যুগের বিভিন্ন উত্তেজনা ও আবেগে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন, তখনও জমিয়ত কেন ধীরস্থির ও প্রাজ্ঞভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে?
* আমার পর্যবেক্ষণে যে সত্য উদ্ভাসিত হয়েছে :
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে যা বুঝেছি তা হলো— জমিয়তের উপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ কামিল বান্দাদের দোয়া সঞ্চিত রয়েছে।
জমিয়ত হুট করে গড়ে ওঠা কোনো সংগঠন নয়। এর মধ্যে রয়েছে আকাবির ও আসলাফদের একটি সুদৃঢ় ধারাবাহিক চেইন। এই চেইনের প্রতিটি স্তরে রয়েছে—
* তাহাজ্জুদের নামাজ
* গভীর দোয়া
* নিঃশব্দ চোখের জল
এই দোয়া ও চোখের জলের মূল্য তারা কখনোই বুঝবে না, যাদের আত্মা মৃত হয়ে গেছে।
* হিকমাহ ও সাকিনাহর প্রকৃত উৎস :
হিকমাহ (প্রজ্ঞা) ও সাকিনাহ (আত্মিক প্রশান্তি) অর্জন করা যায় না—
টাকা-পয়সা দিয়ে, মিছিল-মিটিং দিয়ে,
পেশীশক্তি দিয়ে, বিদেশি শক্তির আশ্রয়ে
কিংবা বড় বড় একাডেমিক সনদ দিয়ে।
যারা আল্লাহকে ভালোবাসে আল্লাহ তাদেরকে হিকমাহ (প্রজ্ঞা) দান করেন।
আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন তাদেরকে তিনি সাকিনাহ দান করেন।
* আকাবিরদের দোয়ার উত্তরাধিকার :
শায়খুলহিন্দ মাহমুদ হাসান (র.) থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যারা জমিয়তের নেতৃত্ব দিয়েছেন বা এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন—তাদের অনেকেই ছিলেন—
হিকমাহ ও সাকিনাহর অধিকারী, আহলে কাশফ, আল্লাহর ওলি। তারা দলের জন্য রেখে যাননি ধন-সম্পদ বা শক্তির উত্তরাধিকার; রেখে গেছেন শুধু দোয়া আর দোয়া। আর এই দোয়ার শক্তি—মাখলুকের সকল শক্তির ঊর্ধ্বে।
* জমিয়ত কেন সৌভাগ্যবান :
এই দিক থেকে জমিয়ত একটি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান রাজনৈতিক সংগঠন। তাই বহু সময়ে জমিয়ত শীতল কণ্ঠে কথা বললেও ভুল পথে অগ্রসর হয়নি।
হ্যাঁ, দু-চারজন ব্যক্তি ভুল করতে পারেন, কিন্তু দল সমষ্টিগতভাবে সেই ভুলকে কখনো গ্রহণ করেনি।
আমার ধারণা, জমিয়তের শক্তি তার বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, বরং তার অন্তর্গত দোয়া, ধারাবাহিকতা ও তাকওয়ার উত্তরাধিকার। আর এ কারণেই সময়ের ঝড়েও সে স্থির থাকে।